মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলোচিত সপ্তম নৌবহর

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের বাইরে সবচেয়ে বড় নেভাল ফোর্স হল সপ্তম নৌবহর।  এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের একটি অংশ। বর্তমানে এর  প্রধান ঘাঁটি জাপানের ইয়োকোসুকা ‘তে। আমেরিকার সবচেয়ে উন্নত ও শক্তিশালী জাহাজগুলোই সপ্তম নৌবহরে থাকে। ৬০ থেকে ৭০টি যুদ্ধ জাহাজ, ২০০-৩০০টি যুদ্ধ বিমান, প্রায় ৪০,০০০ নৌসেনার সমন্বয়ে এটি আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবহর।

সপ্তম নৌবহরের অধীনে রয়েছে টাস্কফোর্স ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪, ৭৬, ৭৮ এবং ৭৯। এর জাহাজগুলো বিভিন্ন জাপানের ইয়োকোসুকো, সাসেবো, গুয়াম দ্বীপে। এর উল্লেখযোগ্য জাহাজগুলো হলো-
USS George Washington (CVN 73), USS Blue Ridge (LCC 19), USS Antietam (CG 54), USS Shiloh (CG 67), USS Curtis Wilbur (DDG 54), USS John S. McCain (DDG 56), USS Fitzgerald (DDG 62), USS Stethem (DDG 63), USS Lassen (DDG 82), USS McCampbell (DDG 85), USS Mustin (DDG 89) ইত্যাদি।

সপ্তম নৌবহরের প্রধান দায়িত্ব প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সামরিক অপারেশন এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমস্ত নৌ বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড বিশেষ করে কোরিয়ান উপদ্বীপের প্রতিরক্ষা যৌথ কমান্ড প্রদান করা ।

সপ্তম নৌবহরের ইতিহাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অ্যাডমিরাল আর্থার এস “চিপস” কারপেন্ডারের অধীনে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে ১৫ মার্চ ১৯৪৩ সালে সপ্তম নৌবহর গঠিত হয়। এটি  ডগলাস ম্যাক আর্থারের অধীনে দক্ষিণ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (SWPA) নিয়োজিত ছিল। এছাড়াও সপ্তম নৌবহর কমান্ডার দক্ষিণ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (SWPA)  যৌথ নৌবাহিনী বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রয়্যাল অস্ট্রেলীয় নৌবাহিনীর অধিকাংশ জাহাজ ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এই নৌবহরের টাস্ক ফোর্স 74 (পূর্বে আনজাক স্কোয়াড্রন)  এর অধীনে ছিল। Battle of Leyte Gulf ; ইতিহাসের বৃহত্তম নৌযুদ্ধের সময় সপ্তম নৌবহর  অ্যাডমিরাল টমাস সি কিনকেইড এর অধীনে  যৌথ বাহিনীর নৌ শক্তির একটি বড় অংশ হিসেবে ছিল।

যুদ্ধের শেষে, সপ্তম নৌবহর চীনের কিংডাও ‘তে তার হেডকোয়ার্ডার বা প্রধান ঘাঁটি স্থানান্তরিত করে। অপারেশন প্ল্যান ১৩-৪৫ এর অধীনে কিনকাইড ১৯৪৫ সালের ২৪ আগস্টে পশ্চিম প্রশান্তমহাসাগরীয় অপারেশনগুলো পরিচালনা করার জন্যে  পাঁচটি প্রধান টাস্ক ফোর্স গঠন করেন।

“টাস্ক ফোর্স ৭১” ৭৫ টি জাহাজ অন্তর্ভুক্ত করে উত্তর চীনে, “টাস্ক ফোর্স ৭২” দ্রুততম ক্যারিয়ার ফোর্স হিসেবে মেরিন ফোর্সকে এয়ার কভার প্রদান ও কমিউনিস্ট বাহিনীর অপারেশনকে বাধা প্রদান, “টাস্ক ফোর্স ৭৩” ৭৫টি জাহাজ যুক্ত ইয়াংটিজে পেট্রোল ফোর্স, “টাস্ক ফোর্স ৭৪” দক্ষিণ চাইনিজ এরিয়া ফোর্স হিসেবে জাপানি ও চাইনার সৈন্যদের পরিবহনে বাধা প্রদান করতে এবং “ টাস্ক ফোর্স ৭৮” উভচর ফোর্স হিসেবে চাইনিজ নৌ বাহিনীর  উভচর বাহিনী’র (III Marine Amphibious Corps) চলাচলকে বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়।

যুদ্ধ শেষে ১ জানুয়ারি ১৯৪৭ সালে নৌবহরের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌ বাহিনী। পরবর্তিতে নৌবহরটি তার প্রাধান অপারেশনাল বেস ফিলিপিনে সরিয়ে নেয় যেখানে নৌ বাহিনী সুবিক বে তাদের নৌ ফেসিলিটি’র উন্নয়ন ঘটায়  আর স্টেগলী পয়েন্টে তাদের এয়ারফিল্ড সরিয়ে নেয়।

শান্তিকালীন সময়ে নৌবহরের অপারেশনাল কমান্ড প্রদান করতেন প্রশান্ত মহাসাগরীয় বহরের কমান্ডার এডমিরাল আর্থার ই রেডফোর্ড, কিন্ত জাপানী সীমায় কিংবা অন্য কোন জরুরী অপারেশনে নেভাল ফোর্স ফার ইস্ট এর অধীনে জেনারেল ডগলাস ম্যাক আর্থারের অধীনে অপারেশন পরিচালিত হত।

১৯৪৯ সালের ১৯ আগস্ট নৌবহরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেভেন্থ টাস্ক ফ্লিট বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম টাস্ক নৌবহর হিসেবে নাম প্রদান করা হয়।  ১৯৫০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী কোরিয়ান যুদ্ধের পূর্বে একে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর হিসেবে নাম প্রদান করা হয়। যা আজও সপ্তম নৌবহর হিসেবে পরিচয় লাভ করে  আছে।

সপ্তম নৌ বহরের কতিপয় যুদ্ধে অংশগ্রহণ

কোরীয় যুদ্ধ

দক্ষিণ কোরিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার তিন বছরের অধিক সময় ধরে  (২৫ জুন ১৯৫০ – ২৭ জুলাই ১৯৫৩) সংঘটিত হওয়া একটি আঞ্চলিক সামরিক যুদ্ধ যা ইতিহাসে কোরীয় যুদ্ধ নামে পরিচিত। উত্তর কোরিয়ার পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীন এবং দক্ষিন কোরিয়ার পক্ষে জাতিসংঘের সন্মতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য কয়েকটি দেশ প্রত্যক্ষভাবে এই যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিল।

১৯৫৩ সালে কোরীয় যুদ্ধ শেষ হলেও এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি হয়নি। জাতিসংঘ বাহিনীর পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর কোরীয় সেনাবাহিনী ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত অস্ত্রবিরতি চুক্তির মাধ্যমে ওই যুদ্ধের অবসান ঘটে। এই যুদ্ধে আড়াই থেকে তিন মিলিয়ন মানুষ হতাহত হয়েছিল বলে ধারনা করা হয়।

কোরীয় যুদ্ধে প্রাধান অপারেশনগুলোতে সপ্তম নৌ বহরের ইউনিটগুলো অংশগ্রহণ করেছিল। যুদ্ধে ব্যবহৃত প্রথম নৌ জেটটি ৩ জুলাই ১৯৫০ সালে  টাস্ক ফোর্স ৭৭ (টিএফ 77) বিমান ক্যারিয়ার থেকে যাত্রা শুরু করে। কোরিয়ার ইংছনে ল্যান্ড করা প্রথম অপারেশনটি সপ্তম নৌবহরের উভচর জাহাজ থেকে পরিচালিত হয়।

যুদ্ধ জাহাজ লুয়া, নিউ জার্সি, মৌশোরী  এবং উইসকনচিং কোরীয় যুদ্ধের সময় সপ্তম নৌবহরের অধীনে যুদ্ধ করে। যুদ্ধের সময় এয়ার উইং ওয়ান ও এয়ার উইং সিক্স মেরিটাম পেট্রোল ফোর্স হিসেবে টাস্ক ফোর্স ৭০, টাস্ক ফোর্স ৭২ ফর্মজা প্রনালী প্যাট্রোল ইউনিট , টাস্কফোর্স ৭৭ এবং সাহায্যকারী স্কোয়াড্রন হিসেবে টাস্ক ফোর্স ৭৯ সপ্তম নৌ বহরের অধীনে যুদ্ধ করে।

 

ভিয়েতনাম যুদ্ধ

পৃথিবীর ইতিহাসে গণহত্যার জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধকে। এ যুদ্ধ এখনো মানুষকে আন্দোলিত করে, শিহরিত করে আর শান্তির পথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও পরাশক্তি মানা হয় আমেরিকাকে। এই আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরাজিত হয়।

প্রায় দুই যুগ স্থায়ী এই যুদ্ধে প্রাণ হারায় ভিয়েতনামের ৩০ লাখ লোক (নিহতের সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত আছে)। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ৫৮ হাজার সেনা নিহত হয়। আধুনিক পরাশক্তির কোনো দেশের জন্য তার সেনাদের এত বড় প্রাণহানির ঘটনা বিশ্বে এটিই প্রথম। এ ছাড়া পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র কোনো একটি পক্ষে যুদ্ধ করে হেরে যাওয়ার নজিরও ভিয়েতনাম যুদ্ধ।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় সপ্তম নৌবহরকে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিশেষ করে এই নৌবহর থেকে পরিচালিত হতো ভিয়েতনামের অভ্যন্তরে বিমান আক্রমণ। ভিয়েতনামের পাহাড়ি জঙ্গলময় অঞ্চলে সৈন্য সরবরাহ, সৈন্যদের রসদ যোগানো, সুনির্দিষ্টভাবে কোনো জায়গায় আঘাত হানার জন্য ব্যবহার করা হয় নানা ধরনের প্রায় ১২,০০০ হেলিকপ্টার। অবশ্য প্রায় ৫,০০০ হেলিকপ্টার ভিয়েতনামী গেরিলারা ধ্বংস করে দিয়েছিল। এর ভিতরে উল্লেখযোগ্য হেলিকপ্টার ছিল- হিউ : বেল ইউএইচ-১ ইরোকুইস, বেল এএইচ-১ কোবরা, বোয়িং সিএইচ-৪৬ সী-নাইট, বোয়িং সিএইচ-৪৭ শিনুক, সিকোরস্কি এইচ-৩৪ চকটাও, সিকোরস্কি এইচএইচ-৩ জলি গ্রিন জায়ান্ট, সিকোরস্কি সিএইচ-৫৩ সী-স্ট্যালিয়ন।

১৯৬৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী সালিসবারী সাউন্ড নামে আমেরিকার একটি নৌ জাহাজ ভিয়েতনামের অভ্যন্তরে অপারেশন দিয়ে সপ্তম নৌবহরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ শুরু হয়। অপারেশন ফ্লামিং ডার্ট নামে উত্তর ভিয়েনামী সৈন্যদের উপরে বোম্বিং করার জন্যে নৌসাপোর্ট দিতে সালিসবারী কাজ করে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে টাস্ক ফোর্স ৭১, টাস্ক ফোর্স ৭৫, টাস্ক ফোর্স ৭৬, টাস্ক ফোর্স ৭৭, টাস্ক ফোর্স ৭৮ , টাস্ক ফোর্স ১১৬ ও ১১৭ অংশ গ্রহণ করে। যুদ্ধে শেষে ১৯৭৫ সালে সপ্তম নৌ বহর দক্ষিন ভিয়েতনামে  রিফিউজি ইভাকোয়েটে অংশ গ্রহণ করে।

উপসাগরীয় যুদ্ধ

উপসাগরীয় যুদ্ধের সূচনা হয় ২রা আগস্ট, ১৯৯০ সালে। ১৯৯১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম নামে সমধিক পরিচিত এই যুদ্ধের সংঘটিত হয় ইরাক এবং ৩৪টি দেশের জাতিসংঘ অনুমোদিত যৌথ বাহিনীর মধ্যে।১৯৯০ সালের ২ আগস্ট ইরাকের সেনাবাহিনী কুয়েত দখল করা শুরু দিয়ে যুদ্ধের শুরু হয়। ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসে ইরাকের কুয়েত আগ্রাসন এবং কুয়েতি ভূ-খন্ড দখলের প্রেক্ষিতে ইরাকী বাহিনীর হাত থেকে কুয়েতকে মুক্ত করাই ছিল এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য।যুক্তরাস্ট্রের রাষ্ট্রপতি জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ সৌদি আরবে সেনা মোতায়েন করেন এবং অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকেও তাদের সেনা পাঠাতে অনুরোধ করেন।

১৯৯০ সালের আগস্টে কুয়েতের বিরুদ্ধে ইরাকী আগ্রাসনের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ সপ্তম নৌ বহরকে নিয়োগ দেন। বহরের কমান্ডার তাৎক্ষনিক জাপানের ইয়াংসোকা থেকে পারস্য উপসাগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা আরম্ভ করে। অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম ও অপারেশন ডেজার্ট শীল্ডের আওতায় ২য় বিশ্ব যুদ্ধের পরে আমেরিকান সেন্ট্রাল নৌ কমান্ড অংশগ্রহণ করে। উপসাগরীয় যুদ্ধে ১৩০ টি’র মত মার্কিন যুদ্ধ জাহাজ ও ৫০ টির মত যৌথ বাহিনীর যুদ্ধে জাহাজ অংশ গ্রহণ করে। মাইন অপসারন, মেরিটাইম অপারেশন ও যুদ্ধ কালীন অপারেশনে জাহাজগুলো অংশগ্রহণ করে।

নৌ সেন্ট্রাল কমান্ড ছয়টি এয়ার ক্র্যাফট ক্যারিয়ার, দুই’টি ব্যাটালশিপ, দু’টি নৌ হসপিটাল জাহাজ, ৩১ টি উভচর এসাল্ট জাহাজ, চারটি মাইন অপসারন ভেসেল এবং আরো বেশি কিছু যুদ্ধ জাহাজ যৌথ বাহিনীর এয়ার ও গ্রাউন্ড ফোর্সের সাহায্যের জন্যে নিয়োজিত করে। উপসাগরীয় যুদ্ধের পরে পুনরায় সপ্তম নৌবহর তার নির্ধারিত স্থানে ফেরত যায়।

সপ্তম নৌবহর ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষালম্বন করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য পাকিস্তানের সহযোগী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র প্রচেষ্টা চালায়।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত দেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘকে ব্যবহার করে− পাকিস্তানের পক্ষে সামরিক শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা চালায়। কিন্তু রাশিয়ার বিরোধিতায় ব্যর্থ হয়ে আমেরিকা একতরফাভাবে তার সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । এ সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধের কারণে সপ্তম নৌবহরের বেশির ভাগ জাহাজ ভিয়েতনামের কাছাকাছি ছিল। ৯ ডিসেম্বর তৎকালীন  যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সন সপ্তম নৌবহর কে বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা দিতে আদেশ দেন।

১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর সপ্তম নৌবহরের কয়েকটি জাহাজ নিয়ে ‘টাস্কফোর্স ৭৪’ গঠন করা হয়। জাহাজগুলো সিঙ্গাপুরে একত্র হয়ে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। সপ্তম নৌবহরে যে সব জাহাজ ছিল তার তালিকাঃ

USS Enterprise: বহরের জাহাজগুলোর মধ্যে প্রধান জাহাজটি হলো USS Enterprise। এই ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী জাহাজ।এখন পর্যন্ত  এটাটি দৈর্ঘ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ। ৭৫ টি জঙ্গি বিমান বহন করছিল যার অধিকাংশ ছিল F-4 Phantom II ফাইটার। বঙ্গোপসাগরে আসার সময় এন্টারপ্রাইজ নিউক্লিয়ার বোমাও বহন করছিল বলে জানা যায়। এটি ছিল টাস্কফোর্স-৭৪এর প্রধান যুদ্ধজাহাজ।

USS Tripoli : এটি একটি অ্যাম্ফিভিয়াস (উভচর) এ্যাসল্ট শিপ। এতে তখন ২০০০ মেরিন সৈন্যের ব্যাটালিয়ন ও ২৫ টি এ্যাসাল্ট  হেলিকপ্টার ছিল।

USS King:  গাইডেড মিসাইলবাহী ডেস্ট্রয়ার।

USS Decatur: গাইডেড মিসাইলবাহী ডেস্ট্রয়ার।

USS Parsons: গাইডেড মিসাইলবাহী ডেস্ট্রয়ার।

USS Bausell (DD-845):  গান ডেস্ট্রয়ার।

USS Orleck (DD-886): গান ডেস্ট্রয়ার।

USS McKean (DD-784): গান ডেস্ট্রয়ার।

USS Anderson: গান ডেস্ট্রয়ার।

USS Haleakala (AE-25): সামরিক রসদবাহী জাহাজ।

একটি নিউক্লিয়ার-এ্যাটাক সাবমেরিন।

১০ ডিসেম্বর সপ্তম নৌ বহর মালাক্কা প্রণালীতে অবস্থান নেয়।  ১১ই ডিসেম্বর রাশিয়ার ওয়াশিংটন প্রতিনিধিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার সাবধান করে দিয়ে বলেন, আগামীকাল ভারতকে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য করাতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেই প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

জাহাজগুলো ১৪ ডিসেম্বর মালাক্কা প্রণালী অতিক্রম করে ১৫ ডিসেম্বর বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে। আমেরিকা সরকার প্রচার করে যে পাকিস্তানী সৈন্যদের পাকিস্তানে ফেরায় সহায়তা করতে টাস্কফোর্স ৭৪ পাঠানো হয়েছে। । কিন্তু রাশিয়া ও ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণে এই নৌবহর বঙ্গোপসাগরে অবস্থান নিতে সাহস করেনি।  এই সময় ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজ INS Vikrant বঙ্গোপসাগরে ন্যাভাল ব্লকেড দিয়ে রেখেছিল। “টাস্কফোর্স ৭৪” বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা দেওয়ার পর একদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের সব জাহজ ধ্বংশ করে দেওয়া হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন আগে থেকেই সপ্তম নৌবহরের বঙ্গোপসাগরে আসার আশঙ্কা করেছিল। তাই আগে থেকেই তারা ভারত মহাসাগরে শুভেচ্ছা সফরে একটি মাইন সুইপার জাহাজ, একটি ডেস্ট্রয়ার, একটি ব্যাটল ট্যাংক ক্যারিয়ার জাহাজ ও একটি সাবমেরিন মোতায়েন করে রেখেছিল। এছাড়া ৫ ডিসেম্বর আরো একটি মাইন সুইপার জাহাজ ও একটি ডেস্ট্রয়ার ভারত মহাসাগরে  এসে অবস্থান নেয়। সোভিয়েত সরকার ৬ টি জাহাজকেই বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি থাকার নির্দেশ দেয়। ৭ ডিসেম্বর রাশিয়া থেকে ১ টি নিউক্লিয়ার বোমাবাহী মিজাইলসহ ব্যাটলক্রুজার, ও একটি নিউক্লিয়ার সাবমেরিন বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

১০ ডিসেম্বর সপ্তম নৌবহরের বঙ্গোপসাগরের দিকে অফিসিয়াল যাত্রা আরম্ভ করার পরে  ১৩ ডিসেম্বর সোভিয়েত সরকার ঘোষনা দেয় সপ্তম নৌবহরকে ঠেকাতে তারা আগের জাহাজগুলোর সাথে তারা আরেকটি এন্টি-ক্যারিয়ার টাস্কফোর্স পাঠাচ্ছে যাতে আছে আরও একটি নিউক্লিয়ার বোমা বহনকারী মিজাইলসহ ব্যাটল ক্রুজার, একটি নিউক্লিয়ার গাইডেড মিজাইল সাবমেরিন, একটি নিউক্লিয়ার এ্যাটাক সাবমেরিন এবং একটি ডেস্ট্রয়ার।

১৫ ডিসেম্বর সপ্তম নৌবহরের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধজাহাজ নিয়োগ করে। এই দিন ২০টি সোভিয়েত রণতরী ভারত মহাসাগরে অবস্থান নেয়। এরপর সপ্তম নৌবহর যুদ্ধে অংশ নেয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখে এবং আমেরিকা সপ্তম নৌবহর ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

১৬ ই  ডিসেম্বর পাকিস্তানী বাহিনীর আত্নসমর্পনের মাধ্যমে বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা লাভের পরে  যুদ্ধে ক্ষেত্রে আমেরিকা’র অবস্থান একা হয়ে পড়ে।  এ সময় যুদ্ধ বাধলে পাকিস্তানের যোগ দানের কোনরুপ সুযোগ ছিল না।  কাছাকাছি ২০ টি সোভিয়েত জাহাজ তো ছিলই। এর উপর একটি গুজব শোনা যায় প্রথম থেকেই যে একটি সোভিয়েত নিউক্লিয়ার এ্যাটাক সাবমেরিন এন্টারপ্রাইজের পিছে আসছে।

১৮ ডিসেম্বর “টাস্কফোর্স ৭৪” কে বঙ্গোপসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে নেওয়া হয়। জানুয়ারী ১৯৭২ পর্যন্ত সেখানেই নৌবহরটি অবস্থান করে। ৭ ই জানুয়ারীর পর টাস্কফোর্স ৭৪ কে পুনরায় ভিয়েতনাম  যুদ্ধে ফেরত পাঠানো হয়।

সপ্তম নৌবহরের আরো কিছু কাজ

১৯৯৪ সাল  থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে এক হয়ে এই নৌবহর বিশেষ দায়িত্ব পালন করছে। ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তাইওয়ানের জন্য বিশেষ সামরিক ব্যবস্থার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ইন্দোনেশিয়া থেকে ১৯৯৬ সালে দ্রুত মার্কিন নাগরিক অপসারণের দায়িত্ব পালন করে। ২০০১ সাল থেকে সপ্তম নৌবহর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিরোধী কার্যক্রম তদারকী শুরু করে।

২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে ভূমিকম্প এবং সুনামি’র দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের উদ্ধার এবং তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় সাহায্যে এই নৌবহর এগিয়ে আসে। এই সময় এই নৌবহরের চিকিৎসালয়-জাহাজ USNS Mercy(T-AH-19)  উদ্ধার অভিযানে অংশগ্রহণ করে। 

এ ছাড়াও ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই মার্চ জাপানের উত্তরাঞ্চলে সুনামি আঘাত করলে এই নৌ বহর সুনামী পরবর্তী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ গ্রহন করে। এই সময় সপ্তম নৌবহর থেকে ২২টি জাহাজ ১৩২টি আকাশযান এই সাহায্য কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে।

এখন পর্যন্ত নিয়োজিত কমান্ডারের তালিকা নিন্মের ছবিতে পাওয়া যাবে।

সূত্রঃ উইকিপিডিয়া

তথ্য সূত্রঃ

১। https://en.wikipedia.org/wiki/United_States_Seventh_Fleet

২। http://www.c7f.navy.mil

৩। নানা ওয়েব পোর্টাল

 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক