সাইমুম সিরিজঃ নতুন ধারার একটি চলমান উপন্যাস

ডাইরীর সাদা বুক। খস্ খস্ শব্দ তুলে এগিয়ে চলেছে একটি কলমঃ

‘… সিং কিয়াং-এর ধুসর মরুভূমি। দূরে উত্তর দিগন্তের তিয়েনশান পর্বতমালা কালো রেখার মত দাঁড়িয়ে আছে। অর্থহীনভাবে শুধু চেয়ে থাকি চারিদিকে। কোন কাজ নেই। জীবনের গতি যেন আমাদের স্তব্ধ হয়ে গেছে। আজ ক’দিন হল যুগ-যুগান্তরের ভিটে মাটি ছেড়ে আমরা ৫ হাজার মুসলমান আশ্রয় নিয়েছি আমাদের জাতীয় ভাইদের কাছে এ সুদূর মরুদ্যানে। অত্যাচারীর চকচকে রক্ত পিপাসু বেয়নেট আর রাইফেলের গলিত সীসা ছিনিয়ে নিয়েছে আমাদের বহু ভাই বহু বোনকে। চোখে আর কারো পানি নেই। শুকিয়ে গেছে অশ্রুর ধারা।

মরু-ঘেরা এ দূর্গম মরুদ্যানে এসে আমাদের যারা একটুখানি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল, ভুল ভেঙ্গে গেল তাদের অচিরেই। একদিন সকালে উঠে শুনলাম এদেশের সে ফেরাউন বাহিনীও এগিয়ে আসছে এদিকে। আব্ব চিৎকার করে বললেন, ‘আমরা বাঘের মুখ থেকে খসে কশাই এর হাতে পড়েছি। আমাদের মাতৃভূমি তুর্কিস্তানের একখন্ড ভূমিতেও আজ আমাদেরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দিবে না শয়তানরা। বুঝলাম আব্বার সহ্য নিঃশেষ হতে চলেছে।

আব্বার আয়োজন শুরু হ’ল যাত্রার। নারী আর শিশুদের চোখের পানিতে ভারি হয়ে উঠল মরুভূমির শুষ্ক বাতাস। এবার শুধু আমরাই নই, মরুদ্যান ও আশে পাশের আরো ৪৫ হাজার মুসলিম নর নারীর উদ্বাস্তু মিছিল এসে শামিল হল আমাদের সাথে।

আমার চার বছরের ভাই ইউসুফ এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমরা আবার কোথায় যাব ভাইজান! বাড়ী গেলে সেই মানুষরা যে আবার মারবে আমাদের? আমি অভয় দিয়ে বললাম, ‘না ভাই আমরা বাড়ী যাচ্ছি না।’

কিন্তু কোথায় যাচ্ছি বলতে পারলাম না। কোথায় যাব আমরা? তাজিকিস্তান কিংবা উজবেকিস্তান। সেতো আর এক সিংকিয়াং। অবশেষে সবাই বুক ভরা আশা নিয়ে তাকালো দক্ষিণের দিকে। উচ্চারিত হলো ভারতের নাম-মুহাম্মদ বিন কাসিমের এ ভারত, মাহমুদ, বাবর, ঈসা খাঁ, টিপু, তিতুমীরের এ ভারত।

মরুভূমির সাদা বালুর উপর দিয়ে এগিয়ে চলল ছিন্নমূল মানুষের আদিগন্ত মিছিল। পিছনে পড়ে রইল সহস্র শতাব্দির স্মৃতি বিজড়িত মাতৃভূমি সিংকিয়াং। কেন এমন হ’ল? কি করেছি আমরা? শুধু তো স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেয়েছি। মানুষের এ চাওয়া তো চিরন্তন। মুসলমান হওয়ার অপরাধে কি এ অধিকার আমাদের থাকবে না?

কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। ধীরে ধীরে তিব্বতের দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা। হঠাৎ একদিন কয়েকটি সামরিক বিমান খুব নীচু দিয়ে আমাদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল গোটা কাফেলায়। তাহলে কি ওরা এখনো পিছু ছাড়েনি আমাদের?

মরুভূমির নিঝুম-নিস্তব্ধ রাত। বাতাসের একটানা শোঁ শোঁ নিঃশ্বাস নিস্তব্ধতার মাঝে তরঙ্গ তুলছে শুধু। উপরে লক্ষ কোটি তারার মেলা। কাফেলার পরিশ্রান্ত পথিকরা কেউ জেগে নেই বোধ হয়। হঠাৎ উত্তর দিগন্ত থেকে ভেসে এল কয়েকটি জেট ইঞ্জিনের ভয়ঙ্কর শব্দ। তারপর বুম! বুম! বুম……

চিৎকার ছুটোছুটি আর্তনাদে গভীর রাত্রির নিশুতি প্রহর ভেঙ্গে পড়ল টুকরো টুকরো হয়ে। ঘুম ভেঙে গেল আমার। বিছানায় উঠে বসেছি। বোবা হয়ে গেছি যেন। আব্বার চিৎকার ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না আমার। কি বিভৎস সে দৃশ্য! আব্বার তাবু জ্বলছে। টলতে টলতে আব্বা ইউসুফকে টেনে নিয়ে আসছেন। ইউসুফের কোমর থেকে পিছন দিকটা নেই, কয়লার মত হয়ে গেছে ওর শরীর। একটি অষ্ফুট চিৎকারই শুধু আমার মুখ থেকে বেরুল …।

যখন জ্ঞান ফিরল, বেলা হয়ে গেছে তখন অনেক। আব্বার দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে তিনি আমায় ডাকছেন। আমি কাছে যেতেই তিনি বললেন ‘মুসা, কাফেলা নিয়ে যত সত্ত্বর পার এখান থেকে সামনে এগিয়ে যাও। মনে …..?

আমি বাধা দিয়ে বললাম, এ সব কি বলছেন আব্বা? আপনি ভাল হয়ে যাবেন। আব্বা ম্লান হাসলেন। বললেন, তাঁর ডাক এলে কেউ সে ডাকে সাড়া না দিয়ে কি পারে মুসা?

একটু থেমে তিনি বললেন, মুসা, ইউসুফ নাই; দুঃখ করো না। পৃথিবীর সমস্ত নিপীড়িত শিশুর মাঝে তোমার ইউসুফকে খুঁজে পাবে। তোমার মা, বাবা নেই বলে কখনো ভেবনা, পৃথিবীর নির্যাতিত মানষের মধ্যে তোমার মা-বাবাকে খুঁজে পেতে চেষ্টা করো।’ অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে পড়ল আব্বার কণ্ঠ। আব্বার মুখ থেকে অষ্ফুটে তাঁর কথা বেরিয়ে এল, মনে রেখ মুসা; শুধু সিংকিয়াং এর মুসলমানদের একার এ দূর্দশা নয়, পৃথিবীর কোটি কোটি তোমার ভাই-বোন এমনিভাবেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। আরও মনে রেখ, তোমার এ মজলুম মুসলিম ভাই বোনদের অশ্রু মোছানোর দায়িত্ব, তাদের অবস্থার পারিবর্তন আনার দায়িত্ব তোমাদের মত তরুণদের। তোমরা স্রষ্টার নির্দেশগুলোর আর তোমাদের গৌরবময় ইতিহাসকে সর্বদা সামনে রেখো। খালেদ, তারিক, মুসা, মুহাম্মদ বিন কাসিমের তলোয়ার যেদিন তোমরা আবার হাতে তুলে নিতে পারবে, দেখবে সেদিন আল্লাহর সাহায্য কত দ্রুত নেমে আসে তোমাদের উপর।

আব্বা তাঁর নিঃসাড় দুর্বল হাত দিয়ে আমার অশ্রু মোছানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বললেন, মুসা, অশ্রু তো মুসলমানদের জন্য নয়। তোমরা সেই জাতি যারা হাত কেটে গেলে পা দিয়ে পতাকা ধরে রাখে। পা কেটে গেলে দাঁত দিয়ে পতাকা ধরে রাখে। আমি অশ্রু মুছে বললাম, আব্বা আমি আর কাঁদব না। দোয়া করুন – ঘরের কোণে বসে কাপুরুষের মত যেন না মরি।

চারিদিকে চেয়ে দেখলাম, গতকাল যারা দুনিয়ার আলো বাতাসে বিচরণ করেছে, তাদেরই হাজার হাজার বিকৃত লাশে মরুভুমির বুক কালো হয়ে উঠেছে। শত শত পোড়া তাঁবুর খন্ড খন্ড অংশ ছিটিয়ে, ছড়িয়ে পড়ে আছে। শত শত এতিম শিশুর সব হারানোর কান্না চারিদিকে মাতম তুলেছে। আবার যখন আব্বার দিকে চাইলাম, চোখ দু’টি তাঁর বুজে গেছে। চোখ দু‘টি আর কোনদিন চাইবে না পৃথিবীর দিকে। একটি অবরুদ্ধ উচ্ছ্বাস যেন ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে চাইল আমার সমগ্র হৃদয়কে। চারিদিক থেকে অন্ধকার এসে সংকীর্ণ করে দিতে চাইল আমার পৃথিবীকে। দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত হতে চেষ্টা করলাম আমি।

কাঁধের উপর একটি কোমল স্পর্শে চমকে উঠলাম। ফিরে দেখলাম ‘ফারজানা’। শুভ্র গন্ড দু‘টি চোখের পানিতে ভেসে যাচ্ছে তার। অশ্রু-ধোয়া কালো চোখ দু’টিতে কি নিঃসীম মায়া। এমন নিবিড়ভাবে ফারজানাকে কোনদিন আমি দেখিনি। ফারজানা সিংকিয়াং এর প্রধান বিচারপতি আমির হাসানের কন্যা।

আমি বললাম, ফারজানা কোন দুঃসংবাদ নেই তো? সে বলল, আমরা ভাল আছি। আব্বা আপানাকে আমাদের তাঁবুতে ডেকেছেন।

মরু সূর্য তখন আগুন বৃষ্টি করছে। আমি জানতাম, ফারজানাদের ছোট্ট একটি তাঁবু। আমি বললাম, চারিদিকে চেয়ে দেখো ফারজানা, তাঁবুর ছায়া আমরা কতজনকে দিতে পারব। যা হোক এদিকের একটা ব্যবস্থা করা যাবেই। তুমি যাও ফারজানা। আমি চাচাজানের সাথে পরে দেখা করব।

আমরা আমাদের দশ হাজার ভাই বোনকে মরু বালুর অনন্ত শয্যায় ঘুমিয়ে রেখে এগিয়ে চললাম সামনে। একদিন গোধূলী মুহুর্তে আমরা পৌঁছুলাম তিব্বত সীমান্তে। দেখলাম তিব্বত সরকার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। জানলাম সিংকিয়াং এর মাটি যাদেরকে আশ্রয় দিতে পারেনি তিব্বতের মাটিতেও তাদের পা রাখবার কোন জায়গা নেই। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত ছিন্নমূল বনি আদমের কোন আবেদন নিবেদন কোন কাজে এল না। আশা ভঙ্গের চরম হতাশায় মৃত্যুর স্তব্ধতা নেমে এল কাফেলা ঘিরে।

এবার কোথায় যাব আমরা? উত্তরে মৃত্যু হাতছানি দিয়ে ডাকছে, দক্ষিণে তিব্বত সীমান্তের দুর্ভেদ্য দেয়াল। আশার একটি ক্ষীণ আলোক বর্তিকা তখন জ্বলছে-কাশ্মীর হয়ে আফগানিস্তান। পথ অত্যন্ত দুর্গম। কিন্তু উপায় নেই তবু।

হিমালয়ের ১৮ হাজার ফিট উঁচু বরফ মোড়া মৃত্যু-শীতল পথ ধরে আফগানিস্তানের দিকে যাত্রা শুরু হল আমাদের। দিন, মাস গড়িয়ে চলল। পার্বত্য পথের কষ্টকর আরোহণ অবরোহণ নিঃশেষ করে দিল মানুষের প্রত্যয়ের শেষ সঞ্চয়টুকু। তার উপর দুঃসহ শীত। প্রতিদিনই শত শত পরিশ্রান্ত মানুষের উপর নেমে আসতে লাগলো মৃত্যুর হিমশীতল পরশ। দুর্বল বৃদ্ধ, কোমল দেহ নারী, অসহায় শিশুরাই প্রধান শিকারে পরিণত হল এর। সবার মত ফারজানার বৃদ্ধ পিতাকেও একদিন হিমালয়ের এক অজ্ঞাত গুহায় সমাহিত করে আমরা এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। ফারজানার অবস্থাও হয়ে উঠেছে মর্মান্তিক। তার আব্বার মৃত্যুর পর সে পাষাণের মত মৌন হয়ে গেছে। বোবা দৃষ্টির শূন্য চাহনির মাঝে কোন ভাবান্তরই খুঁজে পাওয়া যায় না। ওর একটি হাত ধরে আমি পাশাপাশি চলছিলাম। কয়েকদিন পর হাত ধরে নিয়ে চলাও অসম্ভব হয়ে উঠতে লাগল। ভীষণ জ্বর উঠল ফারজানার। পা দু’টি আর উঠতে চায় না ওর।

সেদিন গভীর রাত। ঘুমিয়ে পড়েছে বোধ হয় সবাই। জ্বরের তীব্র ব্যাথায় ফারজানা কাতরাচ্ছে; একটু দূরে বসে অসহায়ভাবে সে দৃশ্য দেখছি আমি। হিমালয়ের নিঃসীম মৌনতার মাঝে ফারজানার অষ্ফুট কাতরানি তীব্র আর্ত বিলাপের মত আমরা সমগ্র হৃদয়কে ক্ষত বিক্ষত করে দিচ্ছে। আমি ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে ওর মাথার পাশে বসলাম। ধীরে ধীরে হাত বুলালাম ওর আগুনের মত ললাটে। ওর দুর্বল দু’টি হাত উঠে এল। তুলে নিল আমার হাত ওর দু’হাতের মুঠোয়। তারপর হাত মুখে চেপে ধরে বাঁধ ভাঙা নিঃশব্দ কান্নায় ভেঙে পড়ল ফারজানা। আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম, কেঁদোনা ফারজানা, কষ্ট এতে আরও বাড়বে।

ফারজানা বলল, আমাকে ভুলাতে চেষ্টা করো না। আমি জানি, আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে। তারপর একটু থেমে ধীরে ধীরে বলল, মুসা ভাই, সজ্ঞানে কখনও কোন পাপ করেছি বলে মনে পড়ে না। তুমি কি আমাকে আশ্বাস দিতে পার-অমর জীবনের সেই জগতে আবার আমি তোমাকে খুঁজে পাব। আব্বার কাছে বলেছিলাম, কাঁদব না। কিন্তু চোখের পাতা দু’টি সহসা ভারি হয়ে উঠল। আমি বললাম, একথা শুধু তিনিই জানেন ফারজানা। তবে বলতে পারি আমি- তিনি তাঁর বান্দার কোন একান্ত কামনাকেই অপূর্ণ রাখেন না।

ফরজানা যেন গভীর পরিতৃপ্তির সাথে চোখ বুজল। অষ্ফুটে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, আল্লাহই তো আমাকে সবচেয়ে ভালো জানেন। চোখ দু’টি আর খুললো না ফারজানা। কোনদিনই তা আর খোলার নয়।

হিমালয়ের বুক চিরে দীর্ঘ পথ চলার পর আমরা যখন আফগান সীমান্তে পৌঁছলাম, ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে আমরা তখন বেঁচে আছি মাত্র ৮৫০ জন……।

অপারেশন তেলআবিব -১ নামে একটি বই’য়ে সিরিজের নায়ক আহমদ মুসা’র বেদনাময় ব্যক্তিগত স্মৃতি চারণ দিয়ে এভাবেই সাইমুম সিরিজ যাত্রা শুরু করে।

সাইমুম সিরিজ বাংলাদেশে একটি জনপ্রিয়  উপন্যাস সিরিজ, যার লেখক আবুল আসাদ।  অন্য সিরিজের মত এটা শুধু থ্রিলার সিরিজ নয়। থ্রিলারের আড়ালে লেখক ইতিহাস, ভুগোল, বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি বিশেষ করে ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ইসলামী বিশ্ব, বিভিন্ন দেশে মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

সাইমুম সিরিজের শুরু

আবুল আসাদ সাইমুম সিরিজ লেখা শুরু করেন ১৯৭৬ সালে। তখন তিনি দৈনিক সংগ্রামের সহ সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে  আবুল আসাদ দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক। তিনি ১৯৪২ আসলে  রাজশাহী জেলার বাগমারা থানার নরসিংহপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া  আবুল আসাদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম.এ পাশ করেন। ছাত্রজীবন থেকে তাঁর লেখক ও সাংবাদিকতা জীবনের শুরু। তিনি কয়েকটি দৈনিক ও সাপ্তাহিকে রাজশাহী সংবাদদাতা হিসাবে কাজ করেছেন।

১৯৭০ সালে ১৭ই জানুয়ারী দৈনিক সংগ্রামে সহকারী সম্পাদক হিসাবে যোগদানের মাধ্যমে তিনি সার্বক্ষণিক সাংবাদিক জীবনের শুরুকরেন। ১৯৮১ সালে তিনি দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি একজন প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট। এ পর্যন্ত প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ইতিহাস গ্রন্থ ‘কাল পঁচিশের আগে ও পরে’ এবং ‘একশ’ বছরের রাজনীতি’, ঐতিহাসিক ঘটনার চিত্রধর্মী গল্প ‘আমরা সেই সে জাতি’ (তিন খন্ড) এবং প্রবন্ধ সংকলন ‘একুশ শতকের এজেন্ডা’। তাঁর সবচেয়ে সাড়া জাগানো সাহিত্যকর্ম হলো সাইমুম সিরিজ। এ পর্যন্ত এই সিরিজের ৬০ টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

আবুল আসাদ পাঠককে রোমাঞ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও শিক্ষামূলক জ্ঞানের মাধ্যমে পাঠকের মনের মধ্যে নৈতিক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটানো এবং তার মাঝে ক্রমে ক্রমে মনুষ্যত্ব এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করার ভাবনাকে সুসংহত করার লক্ষ্য নিয়ে লেখা এই সিরিজটি। এই সিরিজ একজন পাঠকের হৃদয়ে ঈমানের আলো প্রজ্জ্বলিত করে।

আমরা যারা তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা বা কিংবা ফেলুদা পড়েছি তারা একবারের জন্যে হলেও সাইমুম সিরিজ পড়েছেন। সাইমুম সিরিজের বইগুলো অন্যান্য থ্রিলার বা গোয়েন্দা উপন্যাস থেকে ভিন্ন। মুসলিম যুব সমাজ বিভিন্ন ধরণের অসুস্থ সংস্কৃতি  দ্বারা মোহাবিষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারা ইসলাম বিদ্বেষীদের হাজারো পাতা ফাদে আটকে পড়ে নিজেদের মুসলিম স্বকীয়তা ভুলতে শুরু করেছে। অসুস্থধারার সিনেমা ও উপন্যাস যখন নতুন প্রজন্ম বিশেষ করে যুব সমাজকে ধ্বংসের অতল গহ্বরের দিকে হাটছে। এই অবস্থার উত্তরণের জন্যে লেখক আবুল আসাদ এই সিরিজের সূচনা করেন।

ইসলামিক স্কলাররা বলে থাকেন বর্তমান যুগে মানুষকে সিনেমার বিভিন্ন সিরিয়াল ও অন্যান্য অসুস্থ সংস্কৃতি থেকে মুক্ত রাখতে ঠিক একই ধরণের সুস্থ ধারার সিরিয়াল ও সুস্থ সংস্কৃতি তাদেরকে উপহার দিতে হবে। তবেই, সহজে জাতিকে সেগুলোর মরণ ছোবল থেকে মুক্ত রাখা যাবে। সে লক্ষে সাইমুমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

‘সাইমুম সিরিজ’ তরুন সমাজের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। তবে কেউ কেউ এর সমালোচনাও করেছেন।  এ সিরিজের লেখক আবুল আসাদ বলেছেন-

সাইমুম সিরিজটা আসলে আমি লিখেছি এমন একটা সময়ে, আসলে যখন আমি পরিকল্পনা করি ইসলামকে রাজনৈতিকভাবে আনতে হবে। তখন মনে করেছি কাজটা কঠিন হবে। এই জন্য আমি মনে একটা কিছু লিখতে চাই যাতে নতুন জেনারেশনের মধ্যে আমরা যে আলাদা জাতি, আমরা মুসলমান, আমাদের যে আলাদা পরিচয় আছে,- এই জিনিসটা যাতে করে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় সেই বিষয়টাকে সামনে রেখে আমি সাইমুম সিরিজের পরিকল্পনা করি। এবং আমি চেষ্টা করেছি যে, এই সাজেশন সৃষ্টির জন্য যা যা করার দরকার, এই যেমন এর মধ্যে সবকিছুই আছে রোমাঞ্চ আছে, হিস্ট্রি আছে, তারপর এখানে গোয়েন্দা উপন্যাসের সব উপাদানই আছে। কিন্তু এর মূল উদ্দেশ্য হলো সবাইকে একটা দিকনির্দেশনা দেয়া। নিজের আত্মপরিচয়ের দিকে মানুষকে ফিরিয়ে আনা, বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের এখান থেকেই (এই দায়িত্ববোধ থেকেই) আমি আমার বইতে এই উদ্দেশ্য যাতে পূরণ হয় সেভাবেই সিরিজটিকে এগিয়ে নিচ্ছি।

আমার বড় ভাইয়ের পড়ার সুবাধে আমার সাইমুম সিরিজের সাথে পরিচয় ঘটে ক্লাস সেভেনে থাকতে। ভাইয়া বই কিনে আনত।  তখন তিন গোয়েন্দা আর মাসুদ রানা এতটা পেতাম না। তবে নিয়মিত সাইমুমের বই  পেতাম।

সাইমুম নিয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত

সাইমুমের সাথে আমার পরিচয় পর্ব আগেই তুলে ধরেছি। সাইমুম সিরিজে দেখেছি আহমদ মুসাকে কখনো সেনানায়ক হিসেবে কখনো দার্শনিক হিসেবে কখনো বা ধর্ম প্রচারক হিসেবে আবার কখনো ধর্মীয় ইতিহাবেত্তা হিসেবে বা কখনো গোয়েন্দা হিসেবে কখনো মার মার কাট টাইপ নায়ক হিসেবে। যেভাবেই বলি না কেন ছোট্ট বেলায় সাইমুমের আহমদ মুসা ছিল আমার স্বপ্নের নায়ক। ভাবতাম ইস এমন একজন ব্যক্তি যদি সতি সত্যি আমাদের থাকত !

মাসুদ রানাতে মুলত বর্তমান কোন সমস্যা বা সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।এ দিক থেকে সাইমুমে আমরা দেখতে পাই বর্তমান সমস্যা, অতিতের ইতিহাস  এবং অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তির কথা। সাইমুম পড়ার ফলে অনেক প্রযুক্তির সাথে যে রুপ পরিচয় ঘটেছে হয়ত সাইমুম না পড়লে একটু দেরিতে পরিচয়  ঘটত।

আহমদ মুসার সাথে কখনো ঘুরে বেড়িয়েছি স্পেনের ইতিহাস সম্ভৃদ্ধ কর্ডোভায় , কখনো বা সুরিনামে আবার কখনো ফিলিস্থিন ,কখনো আফ্রিকায় , কখনো আমেরিকার রাজপথে , কখনো বা আন্দামান দ্বিপপুঞ্জে। ইতিহাসের সাথে প্রযুক্তি, ধর্মের সাথে স্পাই থ্রিলার সব মিলিয়ে অসাধারন সময় কেটেছে।

জাফা বন্দরের একটি নতুন আস্তানায় সাইমুমের তেলআবিব প্রধান মাহমুদ বসে ভাবছে মুসলমানদের দুরবস্থার কথা। তার মন ছুটে গেছে ১৪’শো বছর আগের একটি ঘটনার দিকে। সিপাহ সালার তারিক মাত্র সাতশো সৈন্য নিয়ে শত্রু অধ্যুসিত স্পেনের মাটিতে নামলেন। তারপর পুড়িয়ে দিলেন ফেরবার একমাত্র উপায় নৌযানগুলো। তাদের সামনে রইলো সুসজ্জিত অগণিত শত্রু সৈন্য আর পেছনে তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ সমুদ্রজল। আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় সম্পর্কে কি দৃঢ় প্রত্যয়!

সেদিনের সেই মুসলিম সিপাহ সালার তারিকের আত্মপ্রত্যয় অবাস্তব আর অবান্তর ছিলো না। শীঘ্রই সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক মুসলমানদের হেলালী নিশানা স্পেনের সীমানা ছাড়িয়ে ফ্রান্সের প্রান্তদেশ পারেনিজ পর্বতমালার বুকে মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে ইসলামের জয় বার্তা ঘোষণা করেছিলো। এই ভূমধ্যসাগরের প্রতিটি ইঞ্চি স্থানে একদিন মুসলমানদের হুকুম চলতো। কিন্তু আজ?? যে স্পেনকে মুসলমানরা আটশো বছর ধরে গড়ে তুললো আপন করে, সেই স্পেনে আজ মুসলমানরা অবাঞ্ছিত। তারা বিধ্বস্ত ও বিতাড়িত। কিন্তু কেন?? ইতিহাস বলে, যখন থেকে মুসলমানরা আপন উসূল এবং ইসলামী জোশ হতে দুরে সরে পড়লো, তখন থেকেই খোদা তাদের এ নিয়ামত কেড়ে নিতে থাকলেন। এরই ফলে আবার একদিন খৃষ্টান শক্তি সেই বিজয়ী মুসলমানদের উত্তরাধীকারীদেরকে এসব দেশ হতে এমনই ভাবে বের করে দিলো যে, সেসব দেশে মুসলমানদের নামের আর কোন চিহ্নই রইলো না।

সৌদী বাদশাহ শাহ ফয়সলের আমরণ সাধ ছিলো – মুক্ত ফিলিস্তিনের মসজিদুল আকসার মুক্ত বুকে দাড়িয়ে তিনি নামাজ আদায় করবেন। শহীদ শাহ ফয়সলের সে স্বপ্ন, সে সাধ পূরণ করতেই এগিয়ে এলো সাইমুম। মজলুম মুসলিম জনতার বিপ্লবী সংগঠন সাইমুম। ফিলিস্তিনের মরুভুমি, মালভুমি ও উপত্যকাকে ঘিরে সাইমুম রচনা করলো এক অমর কাহিনী…  এই “অপারেশন তেলআবিব ২”…

যদিও কিছু সমালোচনা থাকবেই ! সাইমুমকে নিয়েও তেমন ক্ষুদ্র কিছু সমালোচনা রয়েছে। এসব ক্ষুদ্র সমালোচনা সহজেই এড়ানো যায়। সব কিছু ছাপিয়ে সাইমুম আমার কাছে সাইমুমই !

আপনি যদি মাসুদ রানা পড়ে থাকেন তাহলে হয়ত খুব একটা আকৃষ্ট হবেন না, হতেও পারেন, আমি মাসুদ রানা , সাইমুম দুই পড়েছি এক সাথে দুইটার জন্যে দুই রকম অনুভূতি কাজ করে। কোনটাই আমার কাছে অন্যটার আকর্ষণরোধ করতে পারে নি।

আপনি একজন বই লাভার হলে সাইমুম পাঠ শুরু করে দিতে পারেন । আশা করি ঠকবেন না। তবে অনুরোধ বইকে বই হিসেবেই দেখবেন।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক