3

সালমান শাহ্‌

দিনটা ছিল ১৯শে সেপ্টেম্বর। ১৯৭১সালের সেই দিনে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলায় কমর উদ্দিন চৌধুরী ও নীলা চৌধুরীর ঘর আলো করে আসে ছোট্ট একটি শিশু। নাম রাখা হয় ইমন। এই ছোট্ট শিশুই পরবর্তীতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসে। তাঁর অভিনয় সকলের হৃদয় জয় করে নেয়। সেই ইমন আর কেউ নন, ১৯৯০-এর দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা প্রয়াত সালমান শাহ্‌।

সালমান শাহ্‌

পিতা-মাতার প্রথম সন্তান ছিলেন তিনি -শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। তাঁর ছোট ভাই শাহরান ইভান চৌধুরী। খুলনা বয়রা মডেল হাইস্কুল শেষে ১৯৮৭সালে ধানমন্ডির আরব মিশন স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন। পরবর্তীতে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি এবং মালেকা সায়েন্স কলেজ, ধানমন্ডি থেকে স্নাতক শেষ করেন।

সালমান শাহ্‌ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। বন্ধুরা গায়ক হিসেবে চিনত তাঁকে। ১৯৮৬ সালে ছায়ানট থেকে পল্লিগীতিতে উত্তীর্ণও হয়েছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ক্যামেরার সামনে চলে আসেন ইমন। ১৯৮৩সালে ইস্পাহানি গোল্ডস্টার টি এর বিজ্ঞাপনে সর্বপ্রথম তাঁকে দেখা যায়। এরপর জাগুয়ার কেডস (১৯৮৪,১৯৮৫), মিল্কভিটা (১৯৮৮), কোকা-কোলা (১৯৮৯), ফানটা (১৯৯১) এসব এর বিজ্ঞাপনও করেন তিনি। শুধু বিজ্ঞাপনই নয়, এর মধ্যে নাটকে অভিনয়ও শুরু করেন। ১৯৮৫সালে তাঁর অভিনীত একক নাটক ‘আকাশ ছোঁয়া’, ‘দেয়াল’, ‘সব পাখি ঘরে ফিরে’ সম্প্রসারিত হয়। এছাড়াও অভিনয় করেন ‘সৈকতে সারস’ নামক নাটকে। ১৯৯০সালে ‘পাথর সময়’ ধারাবাহিক নাটকে দেখা যায় তাঁকে।
ম্যাজিষ্ট্রেট নাহিদ হাসান (সজীব) হাত ধরেই তিনি অভিনয় জগতে আসেন । কিন্তু পরবর্তী জীবনে নাহিদ হাসান (সজীব) এর সাথে তাঁর সম্পর্ক ভাল ছিল না ।
১৯৯২সালের ১২ই আগস্ট মায়ের বান্ধবীর মেয়ে সামিরাকে বিয়ে করেন তিনি।

১৯৯৩সালে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় ইমনের –জন্ম নেয় সালমান শাহ্‌। সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ছিল “কেয়ামত থেকে কেয়ামত”। সকলের হৃদয়ে সাড়া জাগিয়ে তোলে এই তরুণ অভিনেতা। আর পিছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে। এরপর মুক্তি পায় তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘অন্তরে অন্তরে’।

এর পরের বছর ১৯৯৪সালে তাঁর অভিনীত ৫টি চলচ্চিত্র মুক্তি পায় (‘দেন মোহর’, ‘তোমাকে চাই’, ‘বিক্ষোভ’, ‘বিচার হবে’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’)। এর মধ্যে ধারাবাহিক নাটকও করেন ‘ইতিকথা’(১৯৯৪)।

“ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখো…”। মতিন রহমান পরিচালিত ‘তোমাকে চাই’ চলচ্চিত্রে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর লেখা এই গান এর দৃশ্য ধারণের সময় মেকআপ-ম্যান উপস্থিত ছিলেন না। সালমান শাহ্‌ এর মুখে থাকতে হত দারিদ্র্যের ছাপ। সবাই যখন দুশ্চিন্তায় পরে যায় তখন সালমান নিজেই ড্রেন থেকে ময়লা তুলে শরীরে মেখে একটা মেকআপ তৈরি করে নেন। চোখে-মুখে তাঁর গাড়ির সাইলেন্সার পাইপের ময়লা মেখে বিষণ্নতার ভাব ফুটিয়ে তুলে বলেন, ‘শুটিং শুরু করে দিন।’ এভাবেই অভিনয়ের সাথে মিশে যেতেন তিনি। তাঁর অভিনয় মুগ্ধ করে দিত দর্শককে। সকলের প্রশংসা পেতে শুরু করেন।

১৯৯৫সালে তাঁর অভিনীত ৬টি চলচ্চিত্র পর্দায় দেখা যায় (‘আনন্দ অশ্রু’, ‘আশা ভালবাসা’, ‘জীবন সংসার’, ‘মহা মিলন’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’)।
তাঁর খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পরে।

১৯৯৬সালে দুটি একক নাটকেও অভিনয় করেন তিনি (‘নয়ন’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’)। সে বছর তাঁর অভিনীত ৮টি চলচ্চিত্র মুক্তি পায় (‘এই ঘর এই সংসার’, ‘আঞ্জুমান’, ‘কন্যাদান’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘প্রেম যুদ্ধ’, ‘স্নেহ’, ‘সত্যের মৃত্যু নাই’, ‘সুজন সখী’)। “প্রেম যুদ্ধ” চলচ্চিত্রে প্লে-ব্যাকও করেন তিনি।

সেই বছরের ৬ই সেপ্টেম্বর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। নিজ বাসভবনে ঝুলন্ত অবস্থায় তাঁর লাশ পাওয়া যায়। তাঁকে হত্যা করার অভিযোগ আনা হলেও মেডিকেল রিপোর্ট এর পর তা আত্মহত্যা ছিল বলে ঘোষণা করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে সবাই শোকাহত হয়ে পরে। অনেকে এই খবর পেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

১৯৯৭সালে তাঁর শেষ করা চলচ্চিত্রগুলো মুক্তি পায় (‘তুমি আমার’, ‘প্রিয়জন’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘বুকের ভিতর আগুন’, ‘প্রেম পিয়াসী’)। তিনি সর্বমোট ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। কিছু কাজ শেষ করে যেতে পারেননি (‘শেষ ঠিকানা’, ‘প্রেমের বাজি’, ‘আগুন শুধু আগুন’, ‘কে অপরাধী’, ‘মন মানে না’, ‘ঋণ শোধ’, ‘তুমি শুধু তুমি’)।

সালমান শাহ্‌

চলচ্চিত্রের ধারা বদলে দেন তিনি। সিলেটে শুয়ে আছেন চির-নিদ্রায়। তাঁর অভিনয়ে ছিল অসাধারণ কারুকাজ। অল্প সময়ের জন্য থেকেও দর্শক হৃদয়ে আজও বেঁচে আছেন তিনি –সালমান শাহ্‌।।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

অচ্যুত সাহা জয়
 

"কখনো কোনো পাগলকে সাঁকো নাড়ানোর কথা বলতে হয় না। আমরা বলি না। আপনি বলেছেন। এর দায়দায়িত্ব কিন্তু আর আমার না - আপনার!"