বৌদ্ধ ধাতু জাদী বা বান্দরবন স্বর্ণ মন্দির

ভ্রমণপ্রেমী হলে বাংলাদেশের ভ্রমণ সংক্রান্ত বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ থেকে অবশ্যই স্বর্ণ মন্দির কিংবা বুদ্ধ ধাতু জাদি মন্দিরের নাম শুনে থাকবেন। ধাতু বলতে কোন পবিত্র ব্যক্তির ব্যবহৃত বস্তুকে বোঝায়। এ মন্দিরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বুদ্ধ মূর্তি রয়েছে।

বান্দরবানে নানা উপজাতিদের মধ্যে মারমা জাতিগোষ্টী একটি। তারা হীনযান বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। এ স্বর্ণ মন্দির তাদের উপাসনালয়।  এটি বাংলাদেশে সর্বাপেক্ষা বড় হীনযান বৌদ্ধ মন্দির।  ২০০০ সালে দক্ষিণ পূর্ব এশীয় ধাঁচে বার্মার স্থাপত্যবিদের তত্ত্বাবধানে মন্দিরটি নির্মিত হয়

অবস্থান

বৌদ্ধ মন্দির স্থানীয়দের কাছে কিয়াং নামে পরিচিত। বুদ্ধ জাদি পাই কিয়াং চট্টগ্রাম বিভাগের বান্দরবন জেলায় অবস্থিত। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত মন্দিরটি বালাঘাট থেকে ৪ কিমি এবং বান্দরবন সদর থেকে ১০ কিমি দূরে অবস্থিত। বান্দরবান-রাংগামাটি সড়কের পার্শ্বে পুরপাড়া নামক স্থানে সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় স্বর্ণ মন্দির এর অবস্থান। এই স্বর্ণ মন্দিরটি মহাসুখ মন্দির বা বৌদ্ধ ধাতু জাদী নামেও সমানভাবে পরিচিত। এ স্থানটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নিকট তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। এই বৌদ্ধমন্দিরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বুদ্ধমূর্তি রয়েছে ।

মন্দিরের গঠন

মন্দিরটি সোনালী রংয়ের  এক অপূর্ব নির্মাণ শৈলী ও আধুনিক ধর্মীয় স্থাপত্য নকশার নিদর্শনস্বরুপ এ স্থানটি সবার কাছেই খুবই আকর্ষনীয়। স্বর্ণমন্দির নাম হলেও এখানে স্বর্ণ দিয়ে তৈরি কোন স্থাপনা নেই। তবু মন্দিরে সোনালী রঙয়ের অধিক ব্যবহারহেতু এটি স্বর্ণমন্দির হিসাবে পরিচিত। পাহাড়ের চূড়ায় তৈরী এ সুদৃশ্য প্যাগোডা বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের পবিত্র একটি তীর্থস্থান।

১৯৯৫ সালে শ্রীমং ভেন. ইউ পান্নইয়া জোতা মাহাথেরো এই মন্দিরটি স্থাপন করেন। বান্দরবান শহর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে বালাঘাতের পুরপাড়া নামক এলাকার পাহাড়ের চুড়ায় এই বৌদ্ধ মন্দিরটির অবস্থান। মিয়ানমার থেকে কারিগর এনে এটি তৈরি করা হয়।

এই প্যাগোডার নির্মাণশৈলী মায়ানমার, চীন ও থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ টেম্পল গুলোর অনুকরণে তৈরী। এই প্যাগোডা আধুনিক ধর্মীয় স্থাপত্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র এই তীর্থস্থানটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় ২০০৪ সালে। এই মন্দিরটি প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।

মন্দিরের বাইরের অংশে ভিন্ন ভিন্ন প্রকোষ্ঠে তিব্বত, চীন, নেপাল, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভুটান, মিয়ানমার, কোরিয়া, জাপান ইত্যাদি দেশের শৈলীতে সৃষ্ট ১২টি দণ্ডায়মান বুদ্ধ আবক্ষ মূর্তি এখানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আর মন্দিরের অভ্যন্তরে কাঠের ওপর অসাধারণ সুন্দর রিলিফ ভাস্কর্য কর্ম মিয়ানমারের কাঠের শিল্পকর্মের ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

মন্দিরের ধর্মীয় গুরুত্ব

এই প্যাগোডা দক্ষিন পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য বৌদ্ধ স্থাপনার মধ্যে অন্যতম উপাশনালয়। দেশ বিদেশ থেকে অসংখ্য বৌদ্ধ ধর্মালম্বী এই স্বর্ণমন্দির দেখতে এবং প্রার্থনা করতে আসেন। গৌতমবুদ্ধের সমসাময়িক কালে নির্মিত বৌদ্ধ মুর্তির একটি এখানে স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে তিব্বত, চীন, নেপাল, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভুটান, মিয়ানমার, কোরিয়া, জাপানের আদলে তৈরি  ১২ টি বুদ্ধ  আবক্ষ মূর্তি যা বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের কাছে এটির গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রতিবছর নির্দৃষ্ট সময়ে এখানে মেলা বসে। প্যাগোডাটি পূজারীদের জন্য সারাদিন খোলা থাকে। কিছুদিন আগে দর্শনার্থীদের জন্যে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বর্তমানে দর্শনার্থীদের জন্যে স্বর্ণমন্দির উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

পর্যটকদের কাছে মন্দিরের গুরুত্ব

স্বর্ণমন্দিরটি বর্তমানে বান্দরবান জেলার অন্যতম পর্যটন স্থান হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে।মন্দিরটি শুধু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের তীর্থস্থানই নয়, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় স্পটে পরিণত হয়েছে।  এই প্যাগোডার নির্মাণশৈলী মায়ানমার, চীন ও থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ টেম্পল গুলোর অনুকরণে তৈরী। এই প্যাগোডা আধুনিক ধর্মীয় স্থাপত্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

মন্দির চত্বরের গড়ুড় স্তম্ভ ও পাখি দর্শনার্থীদের বিমুগ্ধ করে। মন্দির থেকে দেখা যায় পুব দিকে বান্দরবান শহর ও চারপাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। এই বৌদ্ধ মন্দিরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বুদ্ধমূর্তি রয়েছে এবং এটি দেশের সর্বাপেক্ষা বড় হীনযান বৌদ্ধ মন্দির।

এই প্যাগোডা থেকে বান্দরবানের বালাঘাটা উপশহর ও এর আশপাশের সুন্দর নৈস্বর্গিকদৃশ্য দেখা যায়। এ ছাড়া বান্দরবান রেডিও ষ্টেশন, বান্দরবান চন্দ্রঘোনা যাওয়ার আকাঁবাকাঁ পথ ও দর্শনীয়।

এ সুউচ্চপাহাড়ের উপর দেবতা পুকুর নামে একটি পানি সম্বলিত ছোট লেক আছে।  লেকটির নাম দেবতা পুকুর। দেবতা পুকুরটি সাড়ে ৩শত ফুট উচুতে হলে ও সব মৌসুমেই পানি থাকে। বৌদ্ধ ভানে-দের মতে, এটা দেবতার পুকুর তাই এখানে সব সময় পানি থাকে। বৌদ্ধরা এ পুকুরকে সম্মানের চোখে দেখে; কারণ এটি যে দেবতা পুকুর! ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও পূর্ণিমায় এখানে জড়ো হন হাজার হাজার পুণ্যার্থী।

ভ্রমণবিধি

বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের জন্যে এ উপাসনালয় ভ্রমণে কোন রুপ বিধি নিষেধ নেই। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ব্যতীত অন্যান্য ভ্রমনার্থীদের টিকিটের বিনিময়ে মন্দিরটি দর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মালম্বী ব্যতীত মন্দিরের মূল অংশে অর্থাৎ যেখানে জাদিটি আছে সেখানে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে দেয়া হয় না।

সন্ধ্যা ছয়টার পরে মন্দিরে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ। আমরা অনেকেই ভ্রমণের সময় থ্রি কোয়ার্টার পড়ে চলা ফেরা করি। তবে মনে রাখতে হবে এ মন্দির  চত্ত্বরে শর্টপ্যান্ট, লুঙ্গি এবং জুতা পায়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাই মন্দিরে প্রবেশের পূর্বে ফুল প্যান্ট পড়ে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। স্বর্ণমন্দিরে প্রবেশ করতে জনপ্রতি ২০ টাকা ফি লাগবে।

কিভাবে যাবেন

আপনি ঢাকা বা চট্টগ্রাম দুই স্থান থেকে বান্দরবান আসতে পারেন । বান্দরমান নেমে এর পরে সিএনজি বা চান্দের গাড়িতে মন্দিরে যেতে হবে।

ঢাকা থেকে

ঢাকার নানা জায়গা থেকে এস. আলম, সৌদিয়া, সেন্টমার্টিন পরিবহন, ইউনিক, হানিফ, শ্যামলি, ডলফিন ইত্যাদি পরিবহনের বাস বান্দারবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। জনপ্রতি এসব বাসের ভাড়া যথাক্রমে নন এসি ৫৫০ টাকা ও এসি ৯৫০-১৫০০ টাকা। ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান যেতে  ৮-১০ ঘন্টার মত সময় লাগে ।

কেউ যদি বাসে না যেয়ে ট্রেনে যেতে চান সে ক্ষেত্রে আপনাকে ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম গামী সোনার বাংলা, সুবর্ণ এক্সপ্রেস, তূর্ণা নিশিতা, মহানগর গোধূলি এইসব ট্রেনে করে চট্রগ্রাম যেতে হবে এর পরে বাসে যেতে হবে।

চট্টগ্রাম থেকে

আপনি যদি চট্টগ্রামে থেকে স্বর্ণ মন্দিরে যেতে চান সে ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের বদ্দারহাট থেকে পূবালী ও পূর্বানী নামের দুটি বাস  বান্দারবানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে, তাদের একটিতে উঠে পড়ুন।  এ দুটি বাসে জনপ্রতি ২২০ টাকা ভাড়া লাগে। চট্রগ্রামের ধামপাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকেও  ২০০-৩০০ টাকা ভাড়ায় বাসে করে বান্দরবান আসা যায়।

বান্দরবান থেকে স্বর্ণ মন্দির যাবার উপায়

বান্দরবান তো ইতিমধ্যে চলে এসেছেন। এবার যেতে হবে স্বর্ণ মন্দির। মন্দিরে যেতে সিএনজি অটোরিক্সা বা চান্দেরগাড়ী/জীপ ভাড়া করতে পারেন। স্বর্ণমন্দির যাওয়া আসার জন্যে ৩০০-৭০০ টাকা  ভাড়া পড়বে।  তবে সাধারণত পর্যটকগন বান্দরবানের আশেপাশে আরও দর্শনীয় জায়গা যেমন নীলগিরি, নীলাচল, চিম্বুক, শৈলপ্রপাত, মেঘলা ইত্যাদি এইসব জায়গা দেখা সহ গাড়ি রিজার্ভ নেয়।

সে ক্ষেত্রে যদি নীলাচল, মেঘলা, স্বর্ণমন্দির ঘুরে দেখতে চান জীপের ভাড়া গুনতে হবে ১০০০-১২০০ টাকা,  চান্দের গাড়িতে পড়বে ১২০০-১৫০০ টাকা আর সিএনজিতে করে পড়বে ৫০০-৮০০ টাকা। তবে অবশ্যই দরদাম করে উঠবেন।

কোথায় খাবেন

পর্যটকদের খাবার জন্য বান্দরবান শহরে খুব ভাল মানের হোটেল আপনি পাবেন না। তবে শহরে মাঝারি মানের বেশ কিছু হোটেল রয়েছে।  তার মধ্যে তাজিং ডং ক্যাফে, মেঘদূত ক্যাফে, ফুড প্লেস রেস্টুরেন্ট, রুপসী বাংলা রেস্টুরেন্ট, রী সং সং, কলাপাতা রেস্টুরেন্ট উল্লেখ্যযোগ্য । যে কোন একটা থেকে নিজের পছন্দ মত হোটেলে তিন বেলার খাবার খেয়ে নিতে পারেন।

থাকবেন কোথায় ?

বান্দরবানে অসংখ্য রিসোর্ট, হোটেল, মোটেল এবং রেস্টহাউজ রয়েছে। যেগুলোতে ৬০০ থেকে ৩০০০ টাকার মধ্যেই রাত্রে থাকতে পারবেন।

হোটেল হিল ভিউ: বান্দরবান শহরের বাস স্ট্যান্ড এর পাশেই। ভাড়া ৮০০ থেকে ২৫০০ টাকা।

হোটেল প্লাজা: বাস স্ট্যান্ড থেকে ৫মিনিট হাঁটা দূরত্বে। ভাড়া ৮০০ থেকে ৩০০০ টাকা।

হোটেল হিলটন: বান্দরবান শহরের বাস স্ট্যান্ড এর কাছেই। ভাড়া ৮০০ থেকে ৩০০০ টাকা।

রিভার ভিউ: শহরের সাঙ্গু নদীর তীর ঘেষে হোটেলটির অবস্থান। ভাড়া ৬০০ থেকে ২০০০ টাকা।

তবে সিজন অনুসারে হোটেলের ভাড়া পরিবর্তন হয়। যদি অফ সিজনে যান তবে হয়ত ২০-৫০% ডিসকাউন্টে থাকতে পারবেন।  এ ছাড়াও আরো অনেক হোটেল-মোটেল রয়েছে।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক