হাতিরঝিলের ইতিহাস – এটি কোথায় অবস্থিত এবং কিভাবে যাব?

হাতিরঝিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার একটি দৃষ্টিনন্দন এলাকা । ইট পাথরের এই ব্যস্ত নগরীতে ক্লান্তিকর নাগরিক জীবনের ক্লান্তি দূর করতে, বর্তমানে রাজধানীর হাতিরঝিল প্রকল্পটি  হয়ে উঠেছে মনোরম এক বিনোদন কেন্দ্র। দিনে বা রাতে যে কেউ হাতিরঝিলে ঘুরে আসতে পারেন ।বাংলাদেশ সরকার বেশ কিছু উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। এটি ২০১৩ সালের ২ রা জানুয়ারী সর্বসাধারনের জন্যে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও তদারকি করার জন্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘স্পেশাল ওয়ার্কস অরগানাইজেশন’ (এসডব্লিউও) কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

প্রকল্পের অন্যতম মূল লক্ষ্য হচ্ছে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা , জলাবদ্ধতা ও বন্যা প্রতিরোধ করা , ময়লা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন , রাজধানীর যানজট নিরসন এবং সৌন্দয্য বৃদ্ধি করা। হাতিরঝিল প্রকল্প চালুর ফলে ঢাকার তেজগাঁও, গুলশান, বাড্ডা, রামপুরা, মৌচাক ও মগবাজার এরিয়া দিয়ে চলাচলকারী যাত্রীরা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন।

হাতিরঝিলের ইতিহাস

আজকের হাতিরঝিলের নাম পূর্ব থেকেই হাতিরঝিল ছিল না।  হাতিরঝিল এক সময় বগা বিল নামে পরিচিত ছিল । কারন এখানে বসত বকের মেলা। উল্লেখ্য কোথাও কোথাও বককে বলা হয় বগা । তা থেকেই বগা বিলের উৎপত্তি।  হাজার হাজার বকের  পদচারণায় এই বগা বিল সাদা হয়ে থাকত বলেই এই বিলের নাম হয়েছিল বগা বিল।

আজকের পীলখানা তথা ধানমন্ডিতে এক সময় ছিল হাতিশালা। সেখানে ছিল অনেক হাতি, তাদের দেখা শোনার মাহুত থাকত। যারা হাতি দেখা শোনা করে তাদের মাহুত বলে ।  ধানমন্ডি তখন আজকের  ধানমন্ডি মত ছিল না। ধানমন্ডিতে তখন  প্রচুর শিয়াল ছিল । এলাকাটি  ঢাকার উত্তরে ছিল বলে একে উত্তরের জাঁতা বা জঙ্গল বলা হতো।

কথিত আছে,  একদিন কিছু হাতি হাতিশালা থেকে দলছুট হয়ে পূর্বদিকে আসা শুরু করে  এবং এক সময় হাতিগুলো বিলে চলে আসে । এই বিলের পানির উষ্ণতা হাতিদের মুগ্ধ করে।  হাতিশালা থেকে  দলছুট হওয়া হাতিগুলোকে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে একসময় মাহুতদের একটি দল হাতিগুলোকে  বগা বিলে  খুঁজে পায়।বগা বিলের পানি এত পরিষ্কার ছিলো যে মাহুতেরা  হাতিগুলোকে ওখানেই গোসল করানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

ব্রিটিশ রাজার ধারাবাহিকতায় ভাওয়ালের রাজাদের পোষা হাতি রাখা হত পিলখানায়। গোসল করানোর জন্যে হাতিগুলোকে নিয়মিত বগা বিলে নিয়ে যাওয়া হত। ইতিহাসের থেকে  জানা যায়, ঢাকার পিলখানা থেকে বেগুনবাড়ি এলাকার বিলে যাওয়ার জন্য হাতিদের  যেসব সড়ক দিয়ে নিয়ে যাওয়া হত  পরবর্তীতে সেসব এলাকারসাথে  হাতি নামটি যুক্ত হয়ে যায়।   ঐ সময়  এসব হাতিগুলোকে ঝিলে আনা নেওয়ার জন্যে এখনকার এলিফ্যান্ট রোড, হাতিরপুল এলাকা ব্যবহার করা হয়। হাতিদের আনা নেওয়ার কারণেই পরবর্তিতে এলাকার নামের সঙ্গে ‘হাতি’ শব্দটি যুক্ত হয়ে যায় ।  নিয়মিত হাতিদের স্নান করানোর কারণে  বগা বিলের  নাম হয়ে যায়  হাতির বিল। সময়ের বিবর্তনে বিল হয়ে যায় ঝিল । আর হাতিদের গোসল করানো  হত হলে এক সময় হাতির বিলের নাম ও হয়ে যায় হাতিরঝিল।

হাতিরঝিলের অবস্থান

হাতিরঝিল প্রকল্পটির অবস্থান ঢাকার কেন্দ্রে। এটি শুরু হয়েছে কারওয়ান বাজারের সোনারগাঁ হোটেল থেকে, বিস্তৃতি লাভ করেছে বনশ্রী পর্যন্ত। হাতিরঝিলকে ঘিরে আছে তেজগাঁও, গুলশান, রামপুরা, বাড্ডা, বনশ্রী, নিকেতন এবং মগবাজার। অর্থাৎ উল্লেখিত  প্রতিটি এলাকা  দিয়েই হাতিরঝিলে প্রবেশ করা যাবে।

 প্রকল্পের পিছনের ইতিহাস

এককালে টলমলে সুন্দর পানির আধার থাকলেও  সময়ের পরিক্রমায়  হাতির ঝিল পরিনত হয় নর্দমায় আর বস্তিবাসীদের থাকার জায়গায়। এর পরেই শুরু হয় সমাজের বিত্তবান ক্ষমতাশীল লোকদের জমি দখল করার প্রতিযোগীতা। যার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হল  বিজিএমইএ ভবন। যা এখনো বেদখলদারিত্ব থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

পরিবেশবাদী ও সাধারন মানুষদের অনেক আন্দোলনও কোন কুল কিনারা হয় নি।  সে সময় হাতিরঝিলকে অবৈধ দখল আর জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষায় অনেক আন্দোলনও হয়েছিল। স্যার আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ সেসব আন্দোলনে পাশে ছিলেন। সোনারগাঁও হোটেলের বিপরীতে পান্থকুঞ্জের পাশে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন মানববন্ধন করেছিল, ‘হাতিরঝিল বাঁচাও’ স্লোগান নিয়ে। তখন তাতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার দাঁড়িয়েছিলেন।

অন্ধ ডোবা হাতিরঝিলকে ঘিরে বাড়ছিল অপরাধমূলক কর্মকান্ড। মাদকসেবীদের আস্তানায় পরিণত হয়েছিল এই জায়গাটি এর ফলশ্রুতিতে জমি দখল সহ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা ও বন্যা প্রতিরোধ, ময়লা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, রাজধানীর যানজট নিরসন এবং সৌন্দর্য্য বাড়াতে সরকার  বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘স্পেশাল ওয়ার্কস অরগানাইজেশন’ (এসডব্লিউও)এর তত্ত্বাবধায়নে পাঁচ বছরে  হাতিরঝিলকে শহরের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে। বর্তমানে ঝিলের বুকে বইছে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ। ঝিলের পানি সারা বছর স্বচ্ছ রাখতে পাম্পের মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা  আছে । ময়লা পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও আছে।

 প্রকল্প উন্নয়ন ও ব্যয়

অসাধারন এ প্রকল্পটির কাজ শেষ হতে দীর্ঘ একটি সময় লাগলেও তা নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল প্রায় ১৩ বছর আগে। ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনের লক্ষে  ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পূর্ব-পশ্চিম সংযোগ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ হিসেবে ৫৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে  পান্থপথ -রামপুরা সংযোগ সড়ক প্রকল্প হাতে নেয়। তখন হাতিরঝিলের খাল ভরাট করে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ছিল।
এর পরে  ২০০১ সালে বিএনপি সরকারও প্রকল্পটি অগ্রাধিকারভিত্তিতে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। একটি পর্যায়ে এসে  ঢাকা ওয়াসার আপত্তির কারণে হাতিরঝিলের খাল ভরাট করে রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। বিকল্প হিসেবে বুয়েট বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শে হাতিরঝিল খালের ওপর একটি এলিভেটেড এক্সপ্রেস রোড তৈরির করে  পান্থপথের সাথে  রামপুরা-প্রগতি সরণি যুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল।
সর্বশেষ বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘হাতিরঝিল এলাকার সমন্বিত উন্নয়ন ও পান্থপথ-প্রগতি সরণি সংযোগ সড়ক’ নামে এ নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।

হাতিরঝিল প্রকল্পটি  মোট ৩০২ একর এলাকা জুড়ে গড়ে তুলা হয়েছে। এই প্রকল্পটি  এক হাজার ৯৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি করা হয়েছে।  এই টাকার মধ্যে জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয়েছে এক হাজার ৪৮ কোটি টাকা। অধিগ্রহণকৃত জমির মধ্যে রয়েছে রাজউকের ৪৬ শতাংশ জমি , ‘কোর্ট অব ওয়াক্স’র ৮১ একর জমি ,  ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি ১৪১ একর ও বিটিভির এক একর জমি। ।  প্রথমে  ২০০৭ সালের  ৮ অক্টোবর একনেকে এক হাজার ৪৭৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকার এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরে, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয়সহ  সংশোধিত প্রকল্প ব্যয়  দাঁড়ায় এক হাজার ৯৭১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ।

তিন বছর মেয়াদী এ প্রকল্পটি প্রথমে ২০১০ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর কাজই  শুরু হয় ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। পরবর্তীতে প্রকল্পটি সংশোধন করে আরো দেড় বছর সময় বাড়ানো হয় । প্রকল্প মোট  এক হাজার ৯৭১ কোটি ৩০ লাখ টাকা  ব্যয়ের মধ্যে বাস্তবায়নকারী সংস্থা রাজউকের এক হাজার ১১৩ কোটি ৭ লাখ, এলজিইডির ২৭৬ কোটি এবং ঢাকা ওয়াসার ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা রয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পটি সম্পূর্ন দেশীয় অর্থায়নে হয়েছে।

প্রকল্পের স্থাপত্য অবকাঠামো

হাতিরঝিল  এর স্থপতি কে ?  এ প্রকল্পের নকশার পরিকল্পনা করেন  স্থপতি এহসান খান । সমন্বিত এ প্রকল্পে রয়েছে হাতিরঝিল  ও বেগুনবাড়ী খাল, যার দুই পাশ দিয়ে যানবাহন চলাচলের জন্য তৈরি করা হয়েছে  ১৬ কিলোমিটার সড়ক, চারটি সেতু, আরো চারটি ক্ষুদ্র সেতু (ভায়াডাক্ট) এবং চলাচলের জন্য চারটি ওভারপাস রয়েছে। যৌথভাবে  এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ১৬ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন, ঢাকা ওয়াসা এবং এলজিইডি। প্রকল্পে পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।আর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তত্ত্বাবধান করছে রাজউক। নকশা অনুযায়ী, এর আওতায় যোগাযোগ অবকাঠামোর জন্য ৮ কিলোমিটার এক্সপ্রেস রোড, ৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার সার্ভিস রোড, ৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার ফুটপাথ, ২৬০ মিটার ভায়াড্যাক্ট, ১২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, ৪০০ মিটার ওভারপাস, ৪৭৭ মিটার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার অংশের কাজ হিসেবে ১০ দশমিক ৪০ কিলোমিটার মেইন ডাইভারশন সুয়ারেজ লাইন , ১৩ কিলোমিটার লোকাল ডাইভারশন সুয়ারেজ , ১৩টি স্পেশাল ডাইভারশন স্ট্রাকচার নির্মাণ করা হয়েছে। ঝিলে সব সুয়ারেজ লাইনের কানেকশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি গৃহস্থলির বর্জ্য যেন বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে ঝিলে আসতে না পারে সেজন্য দু’পাশের রাস্তায় দু’টি শোধনাগার নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ঝিলের পানি আর দূষিত হওয়ার সুযোগ নেই।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য

অসাধারন প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল হাতিরঝিল ও বেগুনবাড়ী খালের পানি দূষণমুক্ত করা, জলাবদ্ধতা দূর করা , রামপুরা, গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকার যানজট নিরসন করা।

মগবাজার কিংবা সাতরাস্তা অথবা কাওরান বাজার এলাকা থেকে বাড্ডা অথবা রামপুরা কিংবা গুলশান যেতে হলে আগে আমাদের যেতে হতো মহাখালী অথবা মৌচাক – মালিবাগ হয়ে । কিন্ত  প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে  এ অতিরিক্ত ভোগান্তি থেকে নগরবাসী মুক্তি পেয়েছে। ফলে   বাড়তি যানজট  আর সময় বাঁচে কমপক্ষে দেড় থেকে দুই ঘন্টা।

রাজধানী ঢাকা শহরকে যানজটমুক্ত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এবং পরিবেশবন্ধব মনোমুগ্ধকর বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা মাথায় রেখে হাতিরঝিল প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছিল। এর সুফল ইতিমধ্যে আমরা কিঞ্চিত হলেও পাচ্ছি। আর এ প্রকল্পটি   নগরবাসীর অন্যতম বিনোদন কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে।

আপনি যদি হাতিরঝিলে না এসে থাকেন তাহলে হাতিরঝিলের ছবি দেখলে মনে হবে একবার সময় করে ঘুরে আসি। 🙂

কিভাবে হাতিরঝিলে যাবেন এবং ঘুরে দেখবেন 

বাস কিংবা সিএনজি বা ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ঢাকার যে কোন এলাকা থেকে হাতির ঝিলে আসতে পারবেন।  হাতিরঝিল প্রকল্প ঘুরে দেখার জন্য আছে চক্রাকার বাস সার্ভিস। বর্তমানে  ২৯ আসনের চারটি মিনিবাস হাতিরঝিলের চারপাশের দশটি স্টপেজ থেকে যাত্রী তুলে এবং নামিয়ে দেয় । টিকেট পাওয়া যায়  রামপুরা, মধুবাগ, এফডিসি মোড়, বৌবাজার, শুটিং ক্লাব ও মেরুল বাড্ডা এই  ছয়টি  কাউন্টারে। এক কাউন্টার থেকে আরেক কাউন্টারে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা। রামপুরা থেকে কারওয়ান বাজার গেলে লাগবে ১৫ টাকা। আর বাসে করে  পুরো হাতিরঝিল ঘুরে দেখা যাবে মাত্র ৩০ টাকায়। হাতিরঝিলে প্রতিদিন বাস চলাচল শুরু হয় সকাল ৭টা থেকে এবং চলে রাত ১১ টা পর্যন্ত । সরকারি ছুটির দিন বা কোনো উৎসবের দিনও চক্রাকার বাস চলাচল বন্ধ থাকেনা।

হাতিরঝিলে অভ্যন্তরে যাতায়াতের জন্য লোকাল আর কোনো  সার্ভিস নেই। ব্যক্তিমালিকানায় কারওয়ান বাজার থেকে কিছু মাইক্রোবাস যায় রামপুরা পর্যন্ত। যেখানেই নামুন ভাড়া ২৫ টাকা ভাড়া ভিত্তিতে।

আর যদি ব্যাক্তিগত গাড়িতে এসে থাকেন তাহলে হয়ত ভাবছেন, নিজের   গাড়ি নিয়ে সে একটু ঘুরা ফেরা একটু ছবি তুলতে চাইলে গাড়ি কোথায় রাখবেন ?   চিন্তা করার কিছুই নেই আপনার  গাড়ি পার্কিং এর ব্যবস্থা আছে এখানে। নির্দিষ্ট পার্কিং জোনে আপনার  গাড়িটি  রেখে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে পারবেন । যেখানে  প্রতি ২ ঘন্টায় মোটর সাইকেলের জন্য পার্কিং চার্জ ২০ টাকা, সিএনজি বা বেবি ট্যাক্সির জন্য ২০ টাকা, প্রাইভেট কারের জন্য ৩০ টাকা, জিপ ও মাইক্রোবাসের জন্য ৩০ টাকা, মিনি কোস্টারের জন্য ৫০ টাকা এবং  বাস ও ট্রাকের জন্য ১০০ টাকা। আপনি যদি সামরিক ব্যক্তি হয়ে থাকেন হাতিরঝিলের সড়কের পাশে সামরিক পার্কিং জোন আছে যেখানে আপনাকে  কোনো পার্কিং  চার্জ দিতে হবে না।

হাতিরঝিলের অভ্যন্তরে যাতায়াতের আরেকটি  ব্যবস্থা হল ওয়াটার ট্যাক্সি। এফডিসির মোড়ে যেই জায়গা থেকে বাস ছাড়ে ঠিক তার বিপরীত দিকেই রয়েছে  ওয়াটার ট্যাক্সি  ল্যান্ডিং স্টেশন ।  এই স্টপেজ  থেকে দুইটি গন্তব্যের উদ্দেশ্যে  ওয়াটার ট্যাক্সি  ছাড়ে । একটি গুদারাঘাটের উদ্দেশ্যে আর অন্যটি রামপুরার উদ্দেশ্যে ছাড়ে। গুদারাঘাটের জন্য আপনাকে  ৩০ টাকা আর রামপুরার জন্য আপনাকে ২৫ টাকা ভাড়া গুনতে হবে । তবে আপনার  ১০ বছরের কম বয়সী বাচ্চার জন্যে জন্য কোনো ভাড়া লাগে না।  যেহেতু এটি জায়গায় জায়গায় নামিয়ে দেয় না তাই ওয়াটার ট্যাক্সি যাতায়াতের তুলনায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য উত্তম।  ওয়াটার ট্যাক্সির  ব্যবস্থাপনা  অবাক করার মত । ওয়াটার ট্যাক্সিতে যাত্রীর জন্য আছে লাইফ জ্যাকেট। আর প্রত্যকেটা  ওয়াটার ট্যাক্সিতেই উড়ে বাংলাদেশের পতাকা। ঝিলের দৃশ্য দেখতে  অতুলনীয় একটি সফর দেওয়া যায় পানি পথে। রাজধানী ঢাকার অভ্যন্তরে এটি ছাড়া এমন জলজ স্থাপনা না থাকায় ২০১৭ সালের বিজয় দিবস উপলক্ষে হাতিরঝিলে নৌকা বাইচ এর আয়োজন হয়েছিল ।

রাস্তার পাশে লাগানো হয়েছে সারিবদ্ধ বিভিন্ন দেশীয় ফুলের গাছ। রয়েছে খেজুর আর তালগাছের সারি। আছে বসার জন্যে নানা জায়গায় বসার বেঞ্চ। এ ছাড়া ঝিলের সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্যে জানা জায়গায় বিশেষ ব্যবস্থা আছে। হাতিরঝিলের অপূর্ব লাইট শো এর ব্যবস্থা আছে। ঝিলের শোভা বাড়াচ্ছে নানান রঙের আলো আর সেই আলোর উৎসে চলছে জলের নৃত্য তথা হাতিরঝিল ফোয়ারা। এই লাইট শো  শুরুর দিকে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১৫ মিনিট অন্তর অন্তর  দেখানো হত। কিন্ত এখন লোকজন কম থাকায় প্রতিদিন হয় না। আপনি যদি এই শো দেখতে চান তাহলে ছুটির দিন যাওয়াটাই শ্রেয় হবে।

ছবিঃ ডেইলি সান

হাতিরঝিলে খাবার

ঘুরা ফেরা করে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছেন ? সমস্যা নেই হাতিরঝিলে রয়েছে  স্ট্রিট ফুড থেকে রেস্টুরেন্টে মজার সব খাবারের আয়োজন।   অভিজাত রেস্টুরেন্ট হিসেবে ক্রুয়া থাই বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।  নিকেতন আড়ং এর পরেই রয়েছে একটি রেস্টুরেন্ট যা খোলা থাকে সকাল ১১টা থেকে রাত ১১টা অব্দি।আর একটি রেস্টুরেন্ট হল  ওয়াটার ট্যাক্সি টার্মিনাল ২ এ। এফডিসি মোড়ের দিকে রয়েছে, রয়েছে রামপুরার মধুবাগের দিকে রেস্টুরেন্টের অবস্থান।   এ ছাড়া হাতিরঝিলের বিভিন্ন পয়েন্টে আপনি পাবেন নানা ফুড কার্টে বাহারী খাবারের সন্ধান।

হাতিরঝিলে ওয়াশরুমের ব্যবস্থা

হাতিরঝিলে নারী আর পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম এবং টয়লেট ব্যবস্থা রয়েছে ।  ১০ টাকা করে টিকিট কাটতে হয় জায়গাটি ব্যবহারের জন্য। তবে ভেতরে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখর জন্য আপনাকে জুতা খুলে প্রবেশ করতে হবে। পাবলিক এই ওয়াশরুম কাম টয়লেটটি অবস্থান হল গুলশান পুলিস প্লাজার সামনে।

হাতিরঝিলের নিরাপত্তা

দিনের বেলা হাতিরঝিল মোটামোটি  নিরাপদ। কিন্তু রাত বাড়ার সাথে সাথে  হাতিরঝিলের নানা যায়গায় নিরাপত্তার অভাব বাড়তে থাকে । সড়কের দুইপাশে, ব্রিজের উপরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকলেও নির্জন জায়গাগুলো ছিনতাইকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। চলাচল কারী  মানুষ প্রায়ই  বিরম্বনায় পড়েন, তবে বিশেষ করে যুগল ভ্রমণকারীদের প্রতি ছিনতাইকারীদের নজর বেশি থাকে। । ছিনতাইকারীরা প্রথমে নানান উপায়ে ঝগড়া বাঁধায়, এরপর ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় করে।   এসব ছিনতাইকারীরা পথচারীর বেশে ঘুরে বেড়ায় আর সুযোগের সন্ধানে থাকে। তাই নির্জন জায়গাগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো। তবে  ইদানিং নানা স্থানে মাদক সেবীদের আড্ডা বাড়ছে।

অনেকেই গভীর রাতে  ফাঁকা রাস্তায়  ড্রাইভ রেস করতে চলে আসেন। বিশেষ করে গুলশানের পুলিশ প্লাজায় দিক দিয়ে গুলশান থেকে রাত বাড়ার  সাথে সাথে দামী গাড়ি নিয়ে ধনীর দুলালরা রেসে নেমে পড়ে। আমি রাত আড়াইটায় একদিন পুলিশ প্লাজার সামনে দাঁড়িয়ে এদের আনাগোনা প্রত্যক্ষ করেছি।  এসময় দুর্ঘটনার মারাত্মক ঝুঁকি থাকে।

যানজটের কবলে এই শহরে বিপর্যস্ত জনজীবন, ধুলোবালিতে ধূসরিত, বিষাক্ত বাতাসে যেন ছেয়ে গেছে চার পাশের পরিবেশ, অবসরে কোথাও।  নেই  দেখার মতো কোনো মনোরম দৃশ্য । এই হতাশা ও বেদনার মধ্যেও একটি অন্যতম বিনোদনের মাধ্যম হাতিরঝিল প্রকল্প।

শেষ করছি হাতিরঝিল নিয়ে   কবি নির্মলেন্দু গুণের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসদিয়ে

 ‘তিন-চার শ বছর ধরে হাতিরঝিল ও বেগুনবাড়ির বর্জ্যস্তূপের ভিতরে আড়ালে ঢাকা পড়েছিল যে-ঢাকা, সেই ঢাকা আজ কী অপরূপ রূপের আলোতেই না উদ্ভাসিত হলো, উন্মোচিত হলো, আবিষ্কৃত হলো। আমি মুগ্ধ। আমি গর্বিত। আমি আনন্দিত। অবশেষে সিঙ্গাপুর, সিডনি, লন্ডন বা প্যারিসের পাশে দাঁড়ানোর মতো একটা ল্যান্ডমার্ক তৈরি হলো আমাদের প্রিয় নগরী ঢাকার ভিতরে।’

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক