গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীঃ ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা ?

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস কিংবা গোড়ার দিকের পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক উত্থানের কথা বলতে গেলে, যে কয়জন নেতার কথা  প্রথম উচ্চারিত হয়, তার মধ্যে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অন্যতম। যিনি এই অঞ্চলের ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ হিসেবে খ্যাত।হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একজন মহান পুরোধা। জীবনের অন্তিম মূহুর্ত পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় গণতন্ত্রের বিকল্প নেই।

ব্যক্তিগত জীবন

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৮৯২ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সোহরাওয়ার্দীর  পিতা জাহিদুর রহিম জাহিদ ছিলেন একজন ব্যারিস্টার  ও কলকাতা হাইকোর্টের একজন খ্যাতনামা বিচারক। তার মা খুজিস্তা আখতার বানু ছিলেন অত্যন্ত বিদূষী- ভদ্র মহিলা। তিনি ভারতীয় প্রথম মুসলিম মহিলা যিনি সিনিয়র কেমব্রিজ পাস করেছিলেন এবং তিনিই প্রথম ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দু সাহিত্যের পরীক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন।

শিশুকালে বিদূষী মায়ের কাছেই সোহরাওয়ার্দীর লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয়। মার সাথেই বাস করতেন নিঃসন্তান মামা স্যার আব্দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী। বিদূষী মা ও বিধ্বান মামা দুজনে ভাবীকালের মহাপুরুষ সোহরাওয়ার্দীকে গড়ে তুলতে লাগলেন।

হাতেখড়ি পালা শেষ হলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী শিক্ষাজীবন শুরু হয় কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায়। এখান থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। মাদরাসার পড়া শেষ করে ইংরেজ চালিত সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে কৃতিত্বের সাথে অনার্সসহ বিএসসি পাস করে ভর্তি হলেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এরপর তিনি তার মায়ের অনুরোধ রক্ষা করতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে আরবি ভাষা এবং সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। অতঃপর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিলাতে গমন করেন। ১৯১৩ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। বিলাতে ১৯১১ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে সম্মানসহ স্নাতক অর্জন করেন। এছাড়া এখানে তিনি আইন বিষয়েও পড়াশোনা করেন এবং বিসিএল ডিগ্রী অর্জন করেন। সমগ্র উপমহাদেশে ক’জন মাত্র বিসিএল ডিগ্রিদারীদের মধ্যে সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অন্যতম। বিসিএল হলো আইন শাস্ত্রের সর্ব্বোচ্চ ডিগ্রি। ১৯১৮ সালে গ্রে'স ইন হতে বার এট ল ডিগ্রী অর্জন করেন। এরপর উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হতে রাষ্ট্র বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করেন।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯২০ সালে বেগম নেয়াজ ফাতেমাকে বিয়ে করেন। বেগম নেয়াজ ফাতেমা ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার আবদুর রহিমের কন্যা।

সবশেষে তিনি ১৯২১ সালে কলকাতায় ফিরে এসে আইন পেশায় নিজেকে  নিয়োজিত করেন। একইসাথে রাজনীতি ও সমাজসেবার দিকে ঝুঁকে পড়েন। তার মামা আব্দুল্লাহ আল মামুন সোহরাওয়ার্দীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় তিনি পুরোপুরি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ১৯২১ সালে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচনে পদপ্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হন। শুরু হলো এই মহান নেতার রাজনৈতিক জীবন। 

রাজনৈতিক জীবন

একজন সফল আইনবিদ ও রাজনীতিবিদ হিসেবে জীবনে বিভিন্ন বিষয়ে পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যপূর্ণ উত্তরাধিকার লাভের পাশাপাশি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাজনৈতিক প্রতিভারও অধিকারী হয়েছিলেন উত্তরাধিকার সুত্রে। সে সময় হাতে গোনা কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা মুসলমান জাতির সরকারী উচ্চপদে কোন ঠাঁই ছিল না। মুসলমানরা সত্যিকার অর্থে ছিল নেতৃত্বহীন, সংগঠনহীন।

উচ্চ ও অভিজাত পরিবারে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও সাধারণ মানুষের দুর্দশা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হৃদয়কে  ব্যথিত করত। অসহায় প্রজার উপর জমিদারের নিপীড়ন, পরাধীন জাতির উপর শ্বেতাংগ শাসকের সীমাহীন অবিচার তাঁকে পীড়া দিত। দেশ ও জাতির প্রতি এ মমত্ববোধই পরবর্তীতে তাঁকে রাজনীতিতে টেনে এনেছিল।

হোসেন শহীদ যখন রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন সে সময় ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলন বাণের পানির মত সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। সবার ধারনা হয় যে , বৃটিশরা ভারত ছেড়ে চলে যাবে। ভারত পাবে স্বাধীনতা। এ সময় সবার মনে একটা ধারনা জন্মে যে,  বৃটিশ ভারত ছেড়ে চলে গেলেও মুসলমানগণ ব্রাহ্মণবাদের  কাছে আটকে থাকবে।  এ চিন্তা থেকে মুসলমানরা আলাদা বাসভূমি কায়েমের প্রচেষ্টা শুরু হয়।

পুরু ভারবর্ষ জুড়ে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলমানদের  আলাদা আবাসভূমি  গঠনের  চেষ্টা চলছিল। ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ মুসলিম অঞ্চল অবিভক্ত বাংলায় এই মহান নেতাই মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ছিলেন। প্রথমে তিনি যোগ দেন চিত্তরঞ্জন দাসের স্বরাজ পার্টিতে। ওই দলটি তখন মূলত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরে একটি গ্রুপ ছিল। ১৯২৩ সালে বাংলায় হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা হয়। এই দাঙ্গায় উভয়পক্ষের অনেক হতাহত হয়, ভবিষ্যতে যাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা না হয় সে জন্য তিনি চিত্তরঞ্জন দাসের সাথে হিন্দু মুসলমান চুক্তি করেন।

এই চুক্তির মধ্যে হিন্দু ও মুসলমানের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সরকারি চাকরিতে ৫৬% মুসলমানের নিয়োগের ব্যবস্থা লিপিবদ্ধ হয়। ফলে মুসলমানগণ সাম্প্রদায়িক বৈষম্য হতে মুক্তি পায় এবং হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই শান্তির মধ্যে বসবাস করতে শুরু করে। ১৯২৩-এর বেঙ্গল প্যাক্ট স্বাক্ষরে হোসেন শহীদের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। ১৯২৪ সালে হোসেন শহীদ কলকাতা পৌরসভার ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হন। 

পরিতাপের বিষয় হল চিত্ত রঞ্জন দাস ১৯২৫ সালে মৃত্যুবরণ করলে বেঙ্গল প্যাক্টও বন্ধ হয়ে যায়। তার অনেক অনুসারীও তার মৃত্যুর পর এই পথ থেকে সরে আসে এবং বেঙ্গল প্যাক্টের চুক্তিগুলো মেনে চলতে রাজি ছিলেন না। চুক্তি ব্যর্থ হওয়ায় মুসলিমরা মর্মাহত হয়। মুসলিমদের কাছে কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অদূরদর্শী ও অতি স্বার্থপর হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেকে কংগ্রেস ও স্বরাজ্য দল থেকে সরে দাঁড়ান।

চিত্তরঞ্জন মারা যাবার  পরে বেঙ্গল প্যাক্টের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে গেলেও হোসেন শহীদ বাংলায় মুসলিম স্বার্থ রক্ষার জন্য সব রকম রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৎপর ছিলেন। এর প্রমাণ মিলে ১৯২৮ সালের শেষ সপ্তাহে নিজ উদ্যোগে কলকাতায় প্রথম নিখিল বঙ্গ মুসলিম কনফারেন্সের আয়োজন করেন। এই সম্মেলনে তিনি লিখিত বক্তব্যে মুসলমানদের স্বার্থের কথা জোড়ালো ভাবে তুলে ধরেন।  এর পরে ১৯২৯ সালের শুরুর দিকে দিল্লিতে সর্বদলীয় মুসলিম নেতাদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ঐতিহাসিক ১৪ দফা দাবি পেশ করেন। 

মুসলমানদের মধ্যে তার ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত মুসলিম লীগের সাথে তিনি জড়িত হননি। ১৯৩৬ সালের শুরুর দিকে তিনি ইন্ডিপেন্ড্যান্ট মুসলিম পার্টি নামক দল গঠন করেন। ১৯৩৬ এর শেষের দিকে এই দলটি বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাথে একীভূত হয়। এই সুবাদে তিনি বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগ তথা বিপিএমএল এর সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন এবং এ পদে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত বহাল থাকেন ।

১৯৩৬ সালে ভারত শাসন আইন প্রবর্তিত হলে ভারতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে হোসেন শহীদের তৎপরতায় বাংলাদেশ মুসলিম আসনগুলোতে অধিকাংশ আসনে মুসলিম লীগ বিজয় হয়। ১৯৩৭ সনে মুসলিম লীগ ও শেরেবাংলার কৃষক প্রজা পার্টি কোয়ালিশন করে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের ১৮০ বছর পর বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন একজন মুসলিম। এর ফলে নবজাগরণ সৃষ্টি হয় মুসলিমদের মধ্যে। শেরেবাংলা প্রধানমন্ত্রী হবার পর বাংলায় মুসলিম রেনেসাঁ দেখা দেয়। বাঙালি মুসলিম জাতির মধ্যে নতুনভাবে আশার সঞ্চার হয়।

১৯৩৭ সনে শেরেবাংলা প্রধানমন্ত্রী হবার পেছনে নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগের বিজয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৩৭ সনের নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিজয়ের পেছনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অবদান অনস্বীকার্য। মূলত তার রাজনৈতিক ত্যাগ ও দূরদর্শিতার ফলেই বাংলায় মুসলিম লীগের বিজয় হয়েছিল। সোহরাওয়ার্দী ১৯৩৭ সালে অখন্ড বাংলার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের মন্ত্রী পরিষদের বাণিজ্য ও শ্রমমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন।

১৯৪০ সালের কথা। এক ছোট্ট মজার ঘটনা ঘটে,তখন অখন্ড বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সাথে গোপালগঞ্জের মিশন হাই স্কুল পরিদর্শনে গেলেন বাণিজ্য ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। স্কুল পরিদর্শন শেষ করে মন্ত্রীদ্বয় ফিরছিলেন ডাক বাংলোর দিকে, এমন সময় সাহসী ছিপছিপে লম্বা এক ছেলের নেতৃত্ব বেশ ক’য়েকজন ছাত্র মন্ত্রীদ্বয়ের পথ অবরোধ করে রাখে। 

স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছেলেগুলোকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। তখন ভয়ে সবাই রাস্তা থেকে সরে গেলেও সেই ছেলেটি কিন্তু নাছোড়বান্দা। ছেলেটি একা সাহসিকতার সাথে দুই দু’জন মন্ত্রীকে রাস্তায় অবরুধ করে রেখে নির্ভয়ে স্কুলের দুরবস্থার কথা জানালো। ছেলেটির অসম্ভব সাহস ও প্রতিবাদী রূপ দেখে মন্ত্রীদ্বয় মুগ্ধ হলেন এবং সাথে সাথে ছেলেটির সকল ন্যায্য দাবী মেনে নিয়ে স্কুল উন্নয়নের জন্য টাকা বরাদ্দ করলেন।

এই ঘটনার পর সোহরাওয়ার্দী ছেলেটির প্রতি দারুণভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। সাহসী ও প্রতিবাদী সেই ছেলেটিকে রাজনীতির অঙ্গনে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখলেন তিনি। সাথে সাথে সোহরাওয়ার্দী ছেলেটি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারলেন, গোপালগঞ্জ মিশন হাই স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রটির নাম শেখ মুজিবুর রহমান। টুঙ্গিপাড়া গ্রামের শেখ লুৎফর রহমানের পুত্র। সোহরাওয়ার্দী ডাক বাংলোয় ফিরে লোক মারফত ডেকে পাঠালেন সেই ছেলেটিকে। অতঃপর ডাক বাংলোয় এসে বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং বাণিজ্য ও শ্রমমন্ত্রীর সাথে ঘনিষ্টভাবে পরিচিত হলো কিশোর শেখ মুজিব। মুজিবকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন সোহরাওয়ার্দী।

এরপর থেকে রাজনীতিবিদ সোহরাওয়ার্দী ও কিশোর মুজিবের মধ্যে গড়ে উঠলো ঘনিষ্ট সম্পর্ক। সোহরাওয়ার্দী নিজের মত করে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চিন্তাধারায় গড়ে তুললেন শেখ মুজিবকে। শেখ মুজিবও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে অর্জন করলেন রাজনৈতিক শিক্ষাগুরুর মহান আদর্শ। পরবর্তী পর্যায়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী যোগ্য রাজনৈতিক উত্তরসূরী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ট নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

১৯৪০ সনে ২৩ মার্চ লাহোরে ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে পাকিস্তান’ পাস হয়। এ সময় মুসলিমদের এক সাথে থাকাটা খুব দরকার হলেও, দুর্ভাগ্যবশত ১৯৪১ সনে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক পরপস্পরের সাথে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। ফলশ্রুতিতে, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও জিন্নাহ্  মুসলিম লীগ থেকে বের হয়ে যান। এ সংকটমময় মূহুর্তে বাংলার মুসলিমদের জন্যে হোসেন শহীদ ত্রাণকর্তারুপে আবির্ভূত হন। হোসেন শহীদ মুসলিম লীগকে বাংলায় সুসংগঠিত করেন।

১৯৪৩ সালে শ্যমা হক মন্ত্রীসভার পদত্যাগের পরে গঠিত খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রীসভায় তিনি একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রীসভায় তিনি শ্রমমন্ত্রী পৌর সরবরাহ মন্ত্রী ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করেছেন ।

ওই বছরই দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে উল্লেখ আছে,

 “এই সময় শহীদ সাহেব লঙ্গরখানা খোলার হুকুম দিলেন। আমি লেখাপড়া ছেড়ে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম। তিনি রাতারাতি বিরাট সিভিল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্ট গড়ে তোললেন। ‘কন্ট্রোল’ দোকান খোলার বন্দোবস্ত করলেন। গ্রামে গ্রামে লঙ্গরখানা করার হুকুম দিলেন। দিল্লিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে ভয়াবহ অবস্থার কথা জানালেন এবং সাহায্য দিতে বললেন।”

১৯৪৫ ও ১৯৪৬ সনে পাকিস্তান ইস্যুতে কেন্দ্র ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যে নির্বাচনে মুসলিম লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। এ বিজয়ের পিছনে ছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অক্লান্ত কঠোর পরিশ্রম। এ দুই নির্বাচনে জয়ী হবার ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। 

১৯৪৬ সনের ৯ ও ১০ই এপ্রিল মুসলিম লীগের দিল্লী কনভেনশনে লাহোর প্রস্তাবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ‘States’ এর স্থলে State উপস্থাপন করলে এক পাকিস্তানের প্রস্তাব পাস করা হয়। মুসলীগ জয়ী না হলে পাকিস্থান সৃষ্টি হত কিনা কে সন্দেহ আছে। আর পাকিস্থান নামক রাষ্ট্র সৃষ্টি না হলে বাংলাদেশ তো পেতামই না। এ পাকিস্থান নামক রাষ্ট্র সৃষ্টিতে জিন্নাহ'র পাশা পাশি হোসেন শহীদের অবদান অনস্বীকার্য।  আর সঙ্গত কারনে আমরা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে বলতে পারি আজকের স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি।

পাকিস্তান সৃষ্টিতে এই মহান নেতার আরেকটি অবদান ১৯৪৬ সনের ১৬ই আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি তখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী।পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে ১৯৪৬ সালে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি তার সমর্থন এবং সহযোগিতা প্রদান করেছেন । স্বাধীন ভারতবর্ষের ব্যাপারে কেবিনেট মিশন প্ল্যানের বিরুদ্ধে জিন্নাহ ১৯৪৬ সালের আগস্ট ১৬ তারিখে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের ডাক দেন ।

বাংলায় সোহরাওয়ার্দির প্ররোচনায় এই দিন সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয় । মুসলমানদের জন্য আলাদা বাসভূমি পাকিস্তানের দাবীতে এই দিন মুসলমানরা বিক্ষোভ করলে কলকাতায় ব্যাপক হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বেধে যায় ।তিনি সরকারি যন্ত্রকে মুসলমানদের জীবন, সম্পত্তি রক্ষায় নিয়োজিত করেন। নিজে স্বয়ং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে মুসলমানদের জানমাল রক্ষা করেন।

১৯৪৭ সনের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৭ সালে শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলার মূখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যান । তবে পদত্যাগের পর শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাথে সাথে পাকিস্তান না গিয়ে কলকাতায় থেকে যান। ভারতের মুসলমানগণ নির্যাতনের মধ্যে পড়ল । এসময় কলকাতার মুসলমানদের সাথে হিন্দুদের পুণরায় বিরোধের সম্ভাবনায় তিনি মহাত্মা গান্ধীর সাহায্য চান।

তিনি ভারতীয় মুসলমানদের অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে পাকিস্তানে চলে আসেননি। ভারতীয় মুসলমানদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য তিনি দিবারাত্রি পরিশ্রম করতে লাগলেন। মহাত্মা গান্ধী এসময় তিনি যৌথ ভূমিকার শর্তে সোহরাওয়ার্দীর হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা প্রশমনের ডাকে সাড়া দেন। মহাত্মা গান্ধীর সাথে তিনি শান্তি স্থাপনের জন্য বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ালেন।

উক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিরসনকল্পে সোহরাওয়ার্দী ও মহাত্মা গান্ধী একই সাথে উক্ত ঐতিহাসিক শান্তি মিশনে ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চল পায়ে হেঁটে সফর করেন। এই মহান দুই নেতার শান্তি মিশনের ফলে তখন ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ হয়। 

১৯৪৭ এর আগস্টে পাকিস্তানের স্বাধীনতার পরে মুসলিম লীগের রক্ষনশীল নেতারা খাজা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে শক্তিশালী হয়ে উঠেন । তার আগে ১৯৪৭ সালের ৫ই আগস্ট খাজা নাজিমুদ্দিন জিন্নাহর পরোক্ষ সমর্থনে মুসলিম লীগের সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন । তারপর থেকে পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতারা কোনঠাসা হয়ে পড়েন । খাজা নাজিমুদ্দিন পূর্ববাংলার মূখ্যমন্ত্রী হবার পর বেশ কয়েকবার সোহরাওয়ার্দীকে ভারতীয় এজেন্ট এবং পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে অভিহিত করেন ।

এদিকে, ১৯৪৮ সনে ৩০ জুন মহাত্মা গান্ধী আততায়ীর হাতে নিহত হলে হিন্দু মুসলিম শান্তি মিশনের কাজ স্থগিত হয়। তিনিও নিরাপত্তাহীনতায় পতিত হন। তিনি পাকিস্তানে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৮ সনের ৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান নাজিমুদ্দিন সরকার পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তিনি ১৯৪৯ সনের মার্চ মাসে করাচী চলে আসেন। পাকিস্তানে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান যে, ততদিনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কায়েমী স্বার্থবাদীদের হাতে চলে গেছে।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে শেখ মুজিব

হোসেন শহীদের অনুসারীদের অনেকে ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগ গঠন করে। এবার তিনি পাকিস্তানে  নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিরোধীদলীয় আন্দোলন শুরু করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩রা জুন ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটির নাম থেকে ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়।

প্রতিষ্ঠালগ্নে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হন আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সহ সভাপতি হন আতাউর রহমান খান,, শাখাওয়াত হোসেন ও আলী আহমদ। টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং সে সময় শেখ মুজিবুর রহমান,, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।এবং কোষাধ্যক্ষ হন ইয়ার মোহাম্মদ খান। কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থাতেই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান মুজিব। অন্যদিকে পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনটির নাম রাখা হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। এর সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

১৯৫৩ সালে তিনি একে ফজলুল হক এবং মাওলানা ভাসানীর সাথে একত্রে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। এই যুক্তফ্রন্টের নেতা ছিলেনঃ ১। মওলানা ভাসানী ২।একে ফজলুল হক ৩। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সেই যুক্তফ্রন্টে ২১ দফার একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেন । ওই ইশতেহারের মধ্যে প্রধান দাবি ছিল ১। লাহোর প্রসত্দাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা । ভাষা শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনার নির্মাণ করা ইত্যাদি বিষয়ে ।

১৯৫৪ সালের অনুষ্ঠিতব্য পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন উপলক্ষে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাভূত করার জন্য আওয়ামিলীগ ও মুসলিম লীগের উদ্যোগে এই যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। ১৯৫৪ সালের মার্চের ৮ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসন পায়। এরমধ্যে ১৪৩টি পেয়েছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। 

আওয়ামী মুসলিম লীগ, যুক্তফ্রন্ট, নেজামে ইসলামী সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সনে প্রাদেশিক নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী হয়। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে প্রাদেশিক সরকার গঠিত হয়। মন্ত্রীসভায় সোহরাওয়ার্দি আইনমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

কিন্তু কাক্সিক্ষত গণতান্ত্রিক পরিবেশের অভাবে স্বল্পকালের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পত্তন ঘটে। ১৯৫৬ সালে চৌধুরি মোহাম্মদ আলির পদত্যাগের পর তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। পররাষ্ট্র বিষয়ে পাকিস্তানের যুক্তরাষ্ট্রপন্থী মনোভাবের ব্যাপারে তাকে অগ্রদূত হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৯৫৬ সালে সংখ্যা-সাম্যের ভিত্তিতে একটি শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়। উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়। কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের ১৩ জন এমএনএ থাকা সত্ত্বেও রিপাকলিকান পার্টির সহযোগিতায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৫৬ সনের ১২ই সেপ্টেম্বর রিপাবলিকান দলের সমর্থনে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যেকার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে তিনি পদক্ষেপ নেন। কিন্তু তার এই পদক্ষেপ ব্যাপক রাজনৈতিক বিরোধিতার জন্ম দেয়।

ষড়যন্ত্র চলতেই থাকে। তার প্রধানমন্ত্রিত্ব যখন ১৪ মাস তখন প্রেসিডেন্ট হলেন ইস্কান্দার মির্জা। এরপর ১৯৫৮ সনের ২৭ অক্টোবর সামরিক আইন জারি করে জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন। চলতে থাকে দেশে সামরিক শাসন। সার্বজনীন ভোটাধিকারের পরিবর্তে আইয়ুব খান প্রচলন করেন কাল ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ প্রথা।

আগস্ট, ১৯৫৯ হতে ইলেক্টিভ বডি ডিসকুয়ালিফিকেশান অর্ডার অনুসারে তাকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিয়মতান্ত্রিকভাবে গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য সদা ব্যস্ত ছিলেন। পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্র বিরোধী কাজের অপরাধ দেখিয়ে তাকে জানুয়ারি ৩০, ১৯৬২ তে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং করাচি সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ করা হয়।  

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানে প্রথম সামরিক শাসন জারি হলেও ১৯৬২ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার জগন্নাথ কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। পরদিন বাংলাদেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ও মিটিং-মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৬২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনজুর কাদির পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা মন্ত্রীকে আক্রমণ ও তার গাড়ি ভাঙচুর করেন। তুমুল আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আইয়ুব খানের সামরিক আইন সারা দেশে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ১৯৬২ সালের ৮ জুন সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হয়। ৬ মাস ২০ দিন কারাজীবনের অবসান ঘটিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৬২ সালের ১৯ আগস্ট মুক্তিলাভ করেন।

মুক্তিলাভের পরই সোহরাওয়ার্দী দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য তদানীন্তন নয়জন নেতাসহ দেশব্যাপী ঝটিকা সফর শুরু করেন। এ পর্যায়ে ১৯৬২ সালের শেষ ভাগে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় ভাষণ দেন। ১৯৬২ সনে ৫ অক্টোবর সর্বদলীয় নেতৃবৃন্দের সমর্থনে একটি জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ে তোলেন। তিনি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের উদ্দেশে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) গঠন করেন।

যে সময় পাকিস্তানে গণতন্ত্রের আন্দোলন তুঙ্গে, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট নিয়ে দিবারাত্র হাড়ভাঙা পরিশ্রম করার ফলে তার শরীর ভেঙে পড়ে। দুর্ভাগ্যবশত তখন শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এখানেই শেষ হয়ে যায় তার বর্ণাট্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। 

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যেমন ছিল সোহরাওয়ার্দীর ঐতিহাসিক অবদান, তেমনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টার অপরাধে পাকিস্তান আমলে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময় বৃদ্ধ বয়সে তাঁকে দীর্ঘদিন কারাবরণ করতে হয়।

হোসেন শহীদের মৃত্যু জন্ম দিয়েছে রহস্য ! 

দীর্ঘ কারাবাস করার ফলে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। ১৯৬২ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তিনি স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বিদেশে যান। সুচিকিৎসার জন্য তিনি ১৯৬৩ সালের ১৯ মার্চ বৈরুত যান। আরোগ্য লাভ করে তিনি লন্ডনে তার পুত্র রাশেদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে ছয় মাস ছিলেন। পুনরায় অসুস্থ হলে বৈরুত যান। শরীর একটু ভালো হলে তিনি দেশে ফেরার পথে বৈরুতে সাময়িক যাত্রা বিরতি করেন। সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতের কন্টিনেন্টাল হোটেলে মৃত্যুবরণ করেন। সেদিন থেকেই জাতি হারালো এক বরেণ্য রাজনীবিদকে। যদিও মৃত্যুর কারন হিসেবে হার্ট এটাক দেখানো হয়েছে, অনেকে সন্দেহ করেন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তাকে সুকৌশলে হত্যা করেছেন। তার মৃত্যুতে ঢাকায় লাখো লোকের জানাজা ও শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।  ঢাকার হাইকোর্টের পাশে তিন নেতার মাজারে প্রখ্যাত এই নেতার সমাধি রয়েছে।

মহাত্মা গান্ধী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিব

ভাষা আন্দোলনসহ আরো বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো একজন মানুষ এখনো আমাদের ইতিহাসে উপেক্ষিত থেকে গেছেন। তাঁকে নিয়ে ইতিহাসও বিকৃত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তাঁকে নিয়ে বলা হয়, ‘শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের তুলনায় সোহরাওয়ার্দীর দেশপ্রেম অনেক কম ছিল, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েও বাংলার জন্য কিছু করেননি’। শুধু তাই নয়, শেরে বাংলাকে নিয়ে অনেক কিংবদন্তী প্রচলিত থাকলেও সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে তেমন কোনো ঘটনা বা ইতিহাস কখনো শোনা যায়নি।

অথচ বৃটিশ ভারতের সবচেয়ে মানবতাবাদী, গণতান্ত্রিক নেতা ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনিই প্রথম মুসলীম লীগের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। শেখ মুজিবকে বাংলার নেতা হিসাবে তিনিই প্রস্তুত করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের প্রভাব যে কতটা স্পষ্ট, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি পড়লেই ঝকঝকে হয়ে উঠবে। বইটিতে সবচেয়ে বেশি বার যার কথা এসেছে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেই রাজনৈতিক গুরু মেনেছিলেন শেখ মুজিব। রাজনীতির একেবারে শুরু থেকেই সোহরাওয়ার্দীর আদর্শেই চলেছেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাই সোহরাওয়ার্দীর প্রভাবটাই ছিল সবচাইতে বেশী।

প্রায় পুরো বইয়েই বঙ্গবন্ধু তাঁকে ‘শহীদ সাহেব’ বলে সম্বোধন করেছেন। স্মৃতিকথায় অসংখ্যবার তার প্রসঙ্গ এসেছে। সোহরাওয়ার্দী ছিলেন একাধারে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে আসার প্রেরণা, রাজনৈতিক পরামর্শদাতা এবং পরম শ্রদ্ধার পাত্র।শুধুমাত্র আদর্শ হিসেবে নয়, তাকে পিতৃতুল্য মনে করতেন মুজিব। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন,

‘শহীদ সাহেব ছিলেন উদার, নীচতা ছিল না, দল মত দেখতেন না, কোটারি করতে জানতেন না, গ্রুপ করারও চেষ্টা করতেন না। উপযুক্ত হলেই তাকে পছন্দ করতেন ও বিশ্বাস করতেন। কারণ, তার আত্মবিশ্বাস ছিল অসীম। তার সাধুতা, নীতি, কর্মশক্তি ও দক্ষতা দিয়ে মানুষের মন জয় করতে চাইতেন। এজন্য তাকে বার বার অপমানিত ও পরাজয় বরণ করতে হয়েছে।’

বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা প্রশ্নে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তখন তিনি ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি।
১৯৫৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মার্কিন কনসাল গ্রে ব্রিম ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিলেন, যুক্তফ্রন্টে নতুন করে চিড় ধরেছে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর অধ্যাপক কাজী কামারুজ্জামান ভাষা প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে একটি জ্বালাময়ী বিবৃতি দিয়েছেন। তাঁর কথায়,

মওলানা ভাসানীর আত্মত্যাগের বিনিময়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে পুনরায় শোষণ করার জন্য সোহরাওয়ার্দী ও তাঁর কোটারি গোষ্ঠী পুনর্বার ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত করছে। আওয়ামী মুসলিম লীগে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একজন প্রকৃত নেতা হতে পারেন না। কারণ, তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার দাবি সমর্থন করেন না এবং তাঁর ‘সর্ব পাকিস্তান জিন্নাহ আওয়ামী মুসলিম লীগ’ও সমর্থন করে না।

১৯৫১ সালের ৬ জানুয়ারি ঢাকার মার্কিন কনসাল চার্লস ডি উইদার্স তাঁর পূর্ব পাকিস্তানে সফর সম্পর্কে একটি বার্তা পাঠান।  উইদার্স লিখেছেন,

‘আমরা অবহিত হয়েছি যে সোহরাওয়ার্দী কার্যত জনতাকে তাঁর হাতের তালুতে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি কখনো উর্দু, কখনো বাংলায় কথা বলেন। তিনি সমবেত জনতার সকল অংশকে সন্তুষ্ট করতে সফল হয়েছিলেন।

ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত একটি পত্রিকার ক্লিপিংয়ে দেখা গেল, সোহরাওয়ার্দী ঢাকার আরমানিটোলা পার্কে আয়োজিত এক জনসভায় বলেন, ‘উর্দুর সঙ্গে বাংলা সর্বত্র পাঠ্য হওয়া উচিত।' তাঁর এই উক্তি শুনে শ্রোতাদের মধ্যে গুঞ্জন ওঠে এবং অনেকেই জনসভা ছেড়ে চলে যেতে থাকেন। কেউ কেউ চিৎকার করে বলেন, কায়েদে আজম তো ইতিমধ্যে আমাদের বলেছেন, কেবল উর্দুই হওয়া উচিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। সোহরাওয়ার্দী তখন বলেন,

‘তিনিও কায়েদের সঙ্গে একমত। তবে কথা হলো, কায়েদে যখন যা-ই বলবেন, তা সব সময় সবটুকু সঠিক হতে পারে না। আমরা যা ভাবি সে অনুযায়ী কাজ করার অধিকার আমাদের আছে।’


চুয়ান্নর ঐতিহাসিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পরে করাচিতে সোহরাওয়ার্দী একটি সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা করেন। এ সম্পর্কে করাচির মার্কিন দূতাবাস ১৯৫৪ সালের ২০ মার্চ একটি প্রতিবেদন পাঠান। এতে দেখা যায়, সোহরাওয়ার্দী নির্দিষ্টভাবে বলেছেন, বাংলাকে অবশ্যই পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। (ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত এ অংশটুকু প্রথম আলো থেকে নেওয়া)

মুজিব জানিয়েছেন,

‘তিনি ঢাকায় আসলেন, ঢাকায় জনসভায়ও বক্তৃতা করলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর বিরোধীদলের এত বড় সভা আর হয় নাই। তিনি পরিষ্কার ভাষায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা, বন্দিমুক্তি, স্বায়ত্তশাসনের সমর্থনে বক্তৃতা করলেন। শহীদ সাহেবের সভার পরে সমস্ত দেশে গণজাগরণ পড়ে গেল। জনসাধারণ মুসলিম লীগ ছেড়ে আওয়ামী লীগ দলে দলে যোগদান করতে শুরু করেছিল।’

শেষ কথা

উপমহাদেশের যে সব রাজনীতিবিদের নাম রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে স্বদেশের গতি পেরিয়ে বিদেশেও বহুল আলোচিত হয়, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাদের অন্যতম।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী। সরকার প্রধান বা বিরোধী দলের নেতা- সর্ব অবস্থায় গণতন্ত্রই ছিল তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। গণতন্ত্র হত্যাকারী স্বৈরাচারের উত্থানকে তিনি মেনে নিতে পারেননি কখনও। তাই তাঁর উপর নেমে আসে তৎকালীন সামরিক চক্রের নির্যাতন। তিনি দমে যান নি । ছিলেন নিজ নীতিতে অটল।

মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি আজীবন সংগ্রাম করে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি, সুনাম ও সুখ্যাতি লাভ করেন। সকল লোভ, স্বার্থ ও ক্ষমতার মোহের উর্ধে উঠে গণতান্ত্রিক চেতনাকে সমুন্নত রাখাই ছিল তাঁর সারা জীবনের সাধনা।

তথ্য সূত্রঃ

১। ইনকিলাব

২। ইত্তেফাক,

৩। সংগ্রাম

৪। উইকিপিডিয়া

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক